অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ঈদযাত্রায় ট্রেনের ছাদে মৃত্যুফাঁদ: দুই দিনে শ্রীমঙ্গলে ২ জনের মৃত্যু, আইন মানছে না যাত্রীরা

প্রকাশিত: ১:০৯ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২৬

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:  ঈদযাত্রায় ট্রেনের ছাদে মৃত্যুফাঁদ: দুই দিনে শ্রীমঙ্গলে ২ জনের মৃত্যু, আইন মানছে না যাত্রীরা

ফয়জুল হক শিমুল:
ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়ি ও কর্মস্থলে ফেরা মানুষের ভিড়ে আবারও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একই এলাকায় ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে একজন নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ (৮ জুন) পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে পড়ে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের মৃত্যু হয়। এর আগের দিন জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এনামুল মিয়া ফাহিম (২৫) ও মো. সিয়াম (১৮)। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফাহিম মারা যান।
প্রশ্ন উঠেছে—যখন ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ আইনত নিষিদ্ধ এবং প্রাণঘাতী ঝুঁকিপূর্ণ, তখন কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? রেলওয়ের তদারকি কতটা কার্যকর? আর আইনই বা কী বলছে?
দুই দিনে একই স্থানে দুই মৃত্যু
(৭ জুন) বিকেলে শ্রীমঙ্গল উপজেলার দ্বারিকা পাল মহিলা ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এনামুল মিয়া ফাহিম ও মো. সিয়াম। ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়ার পথে ফাহিমের মৃত্যু হয়।
এর মাত্র একদিন পর, রোববার (৮ জুন) দুপুরে একই স্থানে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে অজ্ঞাতনামা এক যুবক নিহত হন। আহত হন সামছু মিয়া (৩০) নামে আরও একজন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা রংপুর জেলার বাসিন্দা।
স্থানীয়দের মতে, ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে অনেকেই ঝুঁকি জেনেও ট্রেনের ছাদে উঠে পড়েন।
ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? ৷
রেলওয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত বিপজ্জনক—
চলন্ত ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
সেতু, গাছের ডাল, সিগন্যাল পোস্ট বা ওভারহেড স্থাপনার সঙ্গে ধাক্কা লাগার ঝুঁকি।
বৃষ্টিতে বা ভেজা অবস্থায় পা পিছলে দুর্ঘটনা।
জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়া।
উচ্চগতির বাতাসের চাপেও ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনা।
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার শিপলু সূত্রধর বলেন,
“ট্রেনের ছাদে যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে প্রাণহানির সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। আমরা সব সময় যাত্রীদের ছাদে উঠতে নিষেধ করি। কিন্তু এক শ্রেণির অতি-উৎসুক যাত্রী ছাদে উঠে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।”
আইন কী বলে?
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিন, বাফার কিংবা কোচের বাইরের অংশে ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
রেলওয়ে আইনে অনুমোদিত যাত্রীবাহী অংশ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এছাড়া রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এমন যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া, জরিমানা কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
আইন থাকলেও বাস্তবে উৎসব মৌসুমে হাজারো যাত্রী ছাদে চড়ে ভ্রমণ করেন। ফলে আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কেন বন্ধ হচ্ছে না ছাদে ভ্রমণ?
অনুসন্ধানে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে—
১. ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ
ঈদের সময় ট্রেনের টিকিট সংকট ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক যাত্রী বিকল্প না পেয়ে ছাদে উঠছেন।
২. পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব
স্টেশন এলাকায় অভিযান থাকলেও ট্রেন ছাড়ার পর অনেক যাত্রী ছাদে উঠে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৩. ঝুঁকি সম্পর্কে অসচেতনতা
অনেকেই মনে করেন ছাদে ভ্রমণ একটি “অ্যাডভেঞ্চার” বা সাময়িক সমাধান। কিন্তু সামান্য ভুলেই প্রাণহানি ঘটছে।
৪. কঠোর শাস্তির অভাব
নিয়মিত জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই আইনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
উদ্বেগজনক চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, শতাধিক যাত্রী ট্রেনের ছাদে বসে ভ্রমণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দৃশ্য শুধু আইন লঙ্ঘনের নয়, বরং সম্ভাব্য গণদুর্ঘটনারও ইঙ্গিত
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—
ঈদ ও উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে অতিরিক্ত কোচ ও বিশেষ ট্রেন চালানো।
স্টেশন ও ট্রেনে যৌথভাবে রেলওয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো।
ছাদে ওঠা যাত্রীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
গণসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা।
ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নিরুৎসাহিত করতে মাইকিং ও ডিজিটাল ডিসপ্লে ব্যবহার করা।

মাত্র দুই দিনে শ্রীমঙ্গলে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে দুইজনের প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ কোনোভাবেই ‘সাহসিকতা’ নয়, এটি সরাসরি মৃত্যুঝুঁকি। আইন থাকা সত্ত্বেও কার্যকর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার অভাবে প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ এবং যাত্রীদের সচেতন আচরণ ছাড়া এই মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্তি মিলবে না।

এই সংবাদটি 36 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ