ক্যাডেট কলেজে ৭ম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০১৬

ক্যাডেট কলেজে ৭ম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা ও কিছু কথা

ক্যাডেট কলেজে ৭ম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা ও কিছু কথা

আতাউর রহমান

♦ ক্যাডেটসমূহ বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ন স্থান দখল করে আছে। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশে ক্যাডেট কলেজ শিক্ষার যাত্রা শুরু। ক্যাডেট কলেজগুলোর অভাবনীয় সাফল্য এবং সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ে উপযুক্ত নাগরিক ও মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে কলেজগুলো অনন্য অবদান রেখে চলেছে। বর্তমানে অমাদের দেশে ১২টি ক্যাডেট কলেজ রয়েছে। তন্মধ্যে ৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের।

 

শিক্ষার মান ও পরিবেশের দিকে দিয়ে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষাকে আদর্শ শিক্ষা হিসেবেই ভাবা যায়। আর তাই শিক্ষিত, চাকুরীজিবি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অভিভাবকগণ তাদের ছেলে ও মেয়েকে কোনো ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করাতে চান। উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত একজন অভিভাবক মোটামুটি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন একজন ছেলে বা মেয়েকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করে। কিন্তু ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কিছু নিয়মকানুন রয়েছে।

 

২০১৬ সনে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় (৮ জানুয়ারি)  অংশগ্রহণ করেছিল আমার ছোট ছেলে আবিদ রহমান রানা। ফেব্রুয়ারি ২-৬ তারিখের মধ্যে ফলাফল প্রকাশিত হবে। সেই পরীক্ষা দেয়ানোর সুবাদে ভর্তি তথ্য সংগ্রহ ও পেশায় একজন শিক্ষক হিসেবে অনেক অভিভাবকই জানতে চান কিংবা প্রশ্ন করেন কিভাবে ভর্তি করাবেন তাদের সন্তানদের। এসকল অভিভাবকদের এবং ক্যাডেট কলেজে ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের মোটামুটি একটি ধারণা দেয়ার জন্যই এই লেখা।

 

ক্যাডেট কলেজ আমাদের দেশে ভিন্ন ধরনের এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রতি বছর সপ্তম শ্রেণীতে ছাত্র/ছাত্রী ভর্তি করা হয়। জাতীয় ইংরেজি ও বাংলা সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভর্তির আবেদনপত্র আহবান করা হয়ে থাকে। সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবেদনপত্র বিতরণ শেষে জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা ও ডাক্তারী পরীক্ষার ভিত্তিতে সম্মিলিত মেধা তালিকা প্রণয়ন করে চুড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। লিখিত পরীক্ষা মোট ২০০ নম্বরের হয় । নম্বর বণ্টন এভাবে- ইংরেজিতে ৬৫, গণিতে ৫৫, বাংলা ৪০ ও সাধারণ জ্ঞানে ৪০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয় ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের। ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি নম্বরে পরীক্ষা দিতে হয় কারণ ক্যাডেট কলেজে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি (ইংরেজি ভার্সন)। সাধারণত ৬ষ্ঠ শ্রেণীর অথবা সমমানের পাঠ্যক্রম অনুসরনে প্রশ্নপত্র প্রণীত হয়। উল্লেখ্য যে ক্যাডেট কলেজসমূহে শিক্ষা মাধ্যম ইংরেজি, তবে প্রার্থী ইচ্ছে করলে ভর্তি পরীক্ষা বাংলা কিংবা ইংরেজিতে দিতে পারবে। প্রার্থী তার আবেদনপত্রে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যম উল্লেখ করবে। চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীকে ক্যাডেট কলেজের চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় সকল তথ্য ও সনদপত্রাদি সরবরাহ করতে হয়, অন্যথায় প্রার্থীর নির্বাচন বাতিল বলে গণ্য হয় ।

 

ভর্তিচ্ছুক প্রার্থী নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে বিজ্ঞাপনে উল্লেখিত কলেজে আবেদনপত্র জমা দিবে। আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। ভর্তি বছরের ০১ জানুয়ারি তারিখে বয়স সর্বনিম্ন ১২ বছর ও সর্বোচ্চ ১৪ বছর হতে হবে। কোন প্রার্থী পূর্বে একবার ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলে এবং ক্যাডেট কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় যদি তা প্রকাশ পায়, সেক্ষেত্রে পূর্ণ ক্ষতিপূরন আদায় সাপেক্ষে তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রহণ করা হয়। অতএব অভিভাবক এবং প্রার্থী সকলের উদ্দেশ্যে বলছি, কেউ যাতে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে। প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষার যাবতীয় তথ্য অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক পদ্ধতিতে আর্মি হেডকোয়ার্টারসে (ক্যাডেট কলেজ ব্রাঞ্চে) সংরক্ষণ করা হয়। দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীকে সহজেই সনাক্ত করার ব্যবস্থা আছে।

 

পূর্বে দেখা যেত একজন প্রার্থী একটিমাত্র কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য পছন্দ দিতে পারত, কোনো পছন্দক্রম ছিল না। বর্তমান নিয়মানুযায়ী, একজন প্রার্থী দুটো কলেজে তার পছন্দক্রম দিতে পারবে এবং তৃতীয় আর একটি ঘর আছে সেখানেও সে পছন্দক্রম দিতে পারবে। এই ঘর পূরণ করার অর্থ হচ্ছে কোন প্রার্থী যদি তার বাছাইকৃত কলেজে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয় তাহলে কতৃপক্ষের বাছাইকৃত কোনো কলেজে প্রার্থীর ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকবে। এটি একটি যুগোপযোগী পদ্ধতি।

 

ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও আনা হয়েছে বেশ কিছু পরিবর্তন । বর্তমান পদ্ধতিতে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন সাধারণত ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান বই থেকে আসবে অর্থাৎ প্রার্থীদের অযথা হয়রানি বা আজেবাজে তথ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে না। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া দেশ ও নিকটস্থ দেশের কোনো ঘটনা তাকে জানতে হবে। অন্যকোন মহাদেশে বা অখ্যাত কোনো দেশে কিছু ঘটেছে কিনা তা জানার তেমন আর প্রয়োজন নেই। ভর্তি ফরম পূরণ ও সাথে সাথে প্রার্থীকে একটি সিলেবাস ও প্রসপেক্টাস www.cadetcollege.army.mil.bd ওয়েবসাইটে দেয়া হয় সেখানে মোটামুটি সকল তথ্যাদি সন্নিবেশ করা থাকে ।

 

ভর্তি পরীক্ষার প্রবেশপত্র আগে ডাকযোগে পাঠানো হতো। বর্তমান পদ্ধতিতে প্রার্থী কিংবা  অভিভাবক www.cadetcollege.army.mil.bd তে প্রবেশ করে অনলাইনে ফরম পূরণ করার সাথে সাথে প্রার্থী বা অভিভাবক প্রবেশপত্র প্রিন্ট করে নিবেন। এটি একটি সময়োপোযোগী পদক্ষেপ। বর্তমানে প্রতি বছর  দেশে ১২টি ক্যাডেট কলেজে ৬০০ ক্যাডেট ভর্তি করা হয়। ৬০০ সিটের জন্য দ্বিগুণ প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য রাখা হয়। ভর্তির পর ৭ম এবং ৮ম শ্রেণীকে ফাউন্ডেশন লেভেল ধরা হয়। এই ফাউন্ডেশন লেভেলে কলেজের সমস্ত কর্মকাণ্ড যেগুলো তাদের কাছে নতুন সেগুলোর পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় এবং ইংরেজির ভীত শক্ত করা হয়। উল্লেখ্য ক্যাডেট কলেজের হাউসে (যেখানে ক্যাডেটরা অবস্থান করে) কোনো বাংলা পত্রিকা দেয়া হয় না, সবগুলো ইংরেজি পত্রিকা দেয়া হয়। বাধ্য হয়েই তাদের ইংরেজি চর্চা করতে হয়।

 

ভর্তি প্রক্রিয়ায় একদল সুচতুর, বিচক্ষণ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলীর সমন্বয়ে প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য বোর্ড গঠন করা হয়। তারা প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। একই প্রশ্নপত্রে সকল কলেজের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে পরীক্ষার খাতা কোডিং করা হয় যাতে পরীক্ষকগণ বুঝতে না পারেন কাদের খাতা। খাতায় কোনো প্রার্থীর নাম কিংবা রোল নম্বর থাকে না। এক কলেজের শিক্ষকগণ অন্য কলেজের খাতা পরীক্ষা করে থাকেন। তারপর মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করার সময় বোর্ডের চেয়ারম্যান (কোন এক কলেজের অধ্যক্ষ) বোর্ড শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা পূর্বেও জানেন না উনি কোন বোর্ডে পরীক্ষা নিতে যাচ্ছেন। তাই বলা যায় ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় যথেষ্ট স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়। এ নিয়ে কোনো সংশয় বা প্রশ্ন থাকার কথা নয়।

 

বিঃদ্রঃ প্রতিবেদনটি লিখেছেন মো: আতাউর রহমান ট্রেইনার-ইউআইটিআরসি ও ইংলিশ গ্রামার লেখক। সভাপতি : বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব। টিচার ইন ইংলিশ: খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন, বিয়ানীবাজার, সিলেট।

লেখক : শিক্ষক,  সাংবাদিক, ট্রেইনার উপজেলা আইসিটি ট্রেনিং এন্ড resource সেন্টার ফর এডুকেশন।

এই সংবাদটি 3411 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ