মানব সম্পর্ক ও প্রেষণা [শিক্ষাবিদ মতিউর রহমান মাহমুদ স্মরণে]

প্রকাশিত: ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০১৬

মানব সম্পর্ক ও প্রেষণা [শিক্ষাবিদ মতিউর রহমান মাহমুদ স্মরণে]

শিক্ষক হিসেবে ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর। তাঁর আন্ত:ব্যক্তিগত দক্ষতা ও পেশাভিত্তিক দক্ষতার মাঝে বিরাজমান
ছিল মনুষত্ববোধের ছোঁয়া। যা তাঁকে সমাজের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। আসলেই তিনি ছিলেন একজন শিক্ষার
ফেরিওয়লা। আমাদের কাছে ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর চিন্তা ও মননে ছিল মানব সম্পর্কও প্রেষণা’র চাবি।

 

 

 

 আতাউর রহমান
আজকাল একজন প্রকৃত নাগরিক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যিনি প্রকৃত নাগরিক তিনি কখনো নাম, যশ, প্রশংসা ও
সুখ্যাতির লালায়িত নন। কে কি বলিল, তা নিয়েও তিনি ভাবেন না। তার গলায় পুরুস্কারের মালা ঝুলারও প্রত্যাশা
করেন না। তিনি সারাজীবন প্রতিদানের আশা না করে শুধু দিয়ে যান। এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন লাউতা উচ্চ
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান মাহমুদ। তিনি একজন সংগঠক ও আলোকিত মানুষ। যাঁর জন্ম হয়েছিল
লাউতা ইউনিয়নের পাতন গ্রামে ১৯৪৯ খিস্টাব্দের ১৫ জুন। পাতন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৫৫ সালে তাঁর
শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৬১-তে ভর্তি হন লাউতা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৬৪ সালে জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে
১৯৬৫ সালে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে সানতক ডিগ্রী গ্রহণ
করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম টিচার ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড ডিগ্রী লাভ করেন।
তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে বিয়ানীবাজার পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী
শিক্ষক হিসেবে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে অবৈতনিক শ্রমে নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষে পাতন-আব্দুল্লাহপুর বালিকা উচ্চ
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষকতায় যোগ দেন
লাউতা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে সেখানে সহকারি প্রধান শিক্ষক এবং ১৯৯৩ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত
প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। তিনি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ২০শে
জুন পাড়ি দেন না ফেরার দেশে।
মতিউর রহমান মাহমুদ ছিলেন কথাসাহিত্যিক এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন ’মুক্তবাংলা’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সর্বজন
শ্রদ্ধেয় আকাদ্দাস সিরাজুল ইসলাম’র জামাতা। খালেদ জাফরী ভাই’র দুলাভাই হওয়ার সুবাদে আমার সাথেও তাঁর
কথাবার্তা হতো শালা-দুলাভাই সম্পর্কের নিরিখে। কথাবার্তায় তিনি যেমনি ছিলেন রাশভারী, তেমনি ছিলেন
রসিকও। কথাচ্ছলে, আটকা পড়ে গেলে বলতেন, সাংবাদিক শালারা প্যাচাল ও ভেজাল। ওদের সাথে যুদ্ধে জয়
করা যায়। যা হোক, কেন জানি, আমাকে বেশ আদর করতেন। জমির মালিকানা নিয়ে যখন স্থানীয়ভাবে মাঠ
জরিপ শুরু হয় তখনই আমার সাথে তার সান্নিধ্য বেড়ে যায়। শিবলী জাফরী বলেছে, আমি নাকি জমিজমার দাগখতিয়ান
বেশ বুঝি। তাই এক গাধা দলিল দস্তাবেজ দেখতে হবে। সে সুবাদে দুলাভাই’র বাড়িতে প্রথম যাওয়া।
হায়! হায়! হরেক রকম খাবারের ব্যবস্থা। কোনটা রেখে কোনটা খাই। আদেশ আছে, সব কটা স্পর্শ করতে হবে।
সে খাবারের কথা কোনদিন ভুলার মত নয়। এর পর থেকে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত সমস্যাও মাঝে মাঝে শেয়ার
করতেন। ব্যক্তি জীবনে মতিউর রহমান মাহমুদ অতি সহজ সরল আমায়িক ও নিরহংকারি ছিলেন। সবাইকে অতি
সহজে কাছে নিতে পারতেন। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারতেন অনায়াসে। পাড়াপ্রতিবেশীদের সাথে
তার ছিল গভীর সম্পর্ক। জীবন যাপন করতেন স্বাভাবিক। আর ভাবনা-চিন্তায় তিনি ছিলেন একজন সমাজ
সংস্কাকারক। ছোট-বড় সকলকে তিনি সম্মান করতেন ইজ্জত দিতেন। পারিবারিক জীবনে ছিলেন অত্যন্ত
সেনহপ্রবণ। আসলে মতিউর রহমান মাহমুদ ছিলেন এক হৃদয়বান মানুষ। তার মাঝে কোনদিন পিছুটান দেখিনি।
শিক্ষক হিসেবে ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর। তাঁর আন্ত:ব্যক্তিগত দক্ষতা ও পেশাভিত্তিক দক্ষতার মাঝে বিরাজমান
ছিল মনুষত্ববোধের ছোঁয়া। যা

তাঁকে সমাজের উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। আসলেই তিনি ছিলেন একজন শিক্ষার
ফেরিওয়লা। আমাদের কাছে ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর চিন্তা ও মননে ছিল মানব সম্পর্কও প্রেষণা’র চাবি।
লাউতা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে মানব সম্পর্ক প্রয়োগ করেছিলেন নিরলসভাবে। ব্যবস্থাপনার
ক্ষেত্রে মানব সম্পর্কের বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সফল করার
প্রয়াসে প্রশাসনকে গতিশীল করতে তিনি সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলেন। অধীনস্থদের কাজকে
সমন্বয় করে তাদের আবেগ অনুভুতি, ইচ্ছা অনিচ্ছাকে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানের সুষ্টু পরিবেশ অর্জনে তিনি সক্ষম
হয়েছিলেন। দেখা হলে এসব কথা প্রায়ই শেয়ার করতেন। একদিন জামানপ্লাজায় বসে চা-চক্রে ছিলাম। এ সময়
আমি প্রশ্ন করেছিলাম তাঁকে, ব্যবসা ক্ষেত্রে ‘মানব সম্পর্ক’ মানানসই। কিন্তু শিক্ষাকতায় মানব সম্পর্কে’র কী
প্রয়োজন? তিনি এক বাক্যে বলেছিলেন, ““Human Relation is the study of the ways human beings relate to each other.”-Robert M Fulmer.  অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে
সম্পর্কযুক্ত শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, কর্মচারি, এলাকাবাসী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের লোকজনের পারস্পরিক সম্পর্ক
কি এবং কিভাবে একে অপরের সাথে ব্যবহার করে তাই হচ্ছে মানব সম্পর্ক। প্রতিষ্ঠান প্রধান ‘মানব সম্পকর্’ সম্মন্ধে
অজ্ঞ হলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা খুবই দুরহ ব্যাপার।
আর প্রেষণা বলতে বোঝালেন, প্রাতিষ্ঠানিক জগতে ধনসম্পদ অপেক্ষা জনসম্পদ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মেশিন, অফিস
সরঞ্জাম, কাঁচামাল কিংবা অর্থ কোনটিই উৎপাদনশীলতা বর্ধন করতে পারে না যদি দক্ষ, নিপুণ ও আগ্রহশীল বা
প্রেষণাপ্রাপ্ত কর্মীবৃন্দ না থাকে। যে কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থদের দ্বারা কাজ সুচারুভাবে সম্পাদন করাতে হলে তার
মনে কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা দরকার। এ আগ্রহকে প্রেষণা বলে। প্রেষণা হলো অর্পিত দায়িত্ব আন্তরিকতার
সাথে সম্পাদন করার জন্য আগ্রহের প্রাবল্য। প্রেষণা মানুষের আচরণের সাথে যুক্ত। মানুষ কোন বিশেষ কাজ, কথা
কিংবা চিন্তায় তখনই নিয়োজিত হয় যখন তার উৎস মূলে থাকে প্রেষণা। প্রেষণাই হল- সাফল্যের অন্যতম
চাবিকাঠি। সোজা কথা- প্রেষণা মানুষের লক্ষ্যাভিমুখি আচরণ নিশ্চিত করে।
আজকাল ক’জনা মতিউর রহমান মাহমুদ’র মতো এ ‘মানব সম্পর্ক ও প্রেষণা’ বোঝেন বা রক্ষা করে চলেন। সত্যি,
তাঁর অবর্তমানে তারই রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ আর আগের জায়গায় নেই। এই মানব সম্পর্কও প্রেষণা
দিয়েই তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে সংগঠিত করে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ে এক ও
অভিন্ন ‘শিক্ষা সুপান’ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন সেই সংগঠনের সভাপতি। বেসরকারি
শিক্ষদের ভবিষ্যত চিন্তায় সকলকে নিযে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্ট’। এই প্রতিষ্ঠানটির তিনি ছিলেন
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়াও তিনি ছিলেন বিয়ানীবাজার মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন
করেন। পাশাপাশি পাতন-আব্দুল্লাহপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মূল্লাপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, পাতন মাদ্রাসা,
বিয়ানীবাজার আদর্শ মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠানসমুহের সম্প্রসারণের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল আত্মার আত্মীয়ের
মতো। আর এ সবই সম্ভব হয়েছিল তাঁর ‘মানব সম্পর্ক ও প্রেষণা’র দক্ষতার বদৌলতে। সে কারণে তিনি ছিলেন,
আছেন ও থাকবেন আমাদের মাঝে। তিনি নি:সন্দেহে শিক্ষকসমাজ তথা আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য
অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট। মাস্টার ট্রেইনার-ইউআইটিআরসিই। সভাপতি: বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

এই সংবাদটি 881 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ