সিলেটে সিএনজি চালকদের দৌরাত্ম্য

প্রকাশিত: ১:০৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

সিলেটে সিএনজি চালকদের দৌরাত্ম্য

স্টাফ রিপোর্টার :
সিলেট নগরীতে সিএনজি অটোরিকশার চালকদের একটি চক্রের বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানি, প্রতারণা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থেকে যাত্রী তুলে নির্ধারিত গন্তব্যে না নিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
এমনই একটি অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ৯টা ২০ মিনিটে। দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সিলেট প্রতিনিধি ও সময়চিত্র পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ফয়জুল হক শিমুলের অভিযোগ, একজন রোগীকে দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি নগরীর কুদরত উল্লাহ মার্কেটের সামনে থেকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার জন্য একটি সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন। কিন্তু চালক নির্ধারিত গন্তব্য মেডিকেলের পরিবর্তে তাকে কাজিরবাজার ব্রিজের দিকে নিয়ে যেতে থাকেন।
এ সময় বিষয়টি নিয়ে চালকের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। সাধারণ যাত্রী ভেবে চালক তার সঙ্গে গালাগাল ও মারমুখী আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে নিজের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও চালক উত্তেজিত আচরণ করলেও এবং ভাড়া নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ার চেষ্টা করেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে ৯৯৯-এর মাধ্যমে সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) আবু বক্করের সঙ্গে তার কথা হয় বলে জানান তিনি। পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় চালক ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। তবে তিনি সিএনজি অটোরিকশাটির নম্বর সংরক্ষণ করেছেন বলে জানান।
ওসি (তদন্ত) আবু বক্কর তাকে প্রয়োজনে পুলিশ পাঠানোর কথা জানান বলে দাবি করেন সাংবাদিক ফয়জুল হক শিমুল। তবে চালক ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ায় তিনি বিষয়টি পরবর্তীতে থানায় অবহিত করবেন এবং প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন বলে জানান তিনি। ৷
সিএনজিতে পকেটমারের অভিযোগ-
এদিকে নতুন ব্রিজ, কদমতলী বাসস্ট্যান্ড ও হুমায়ুন চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে সিএনজিতে যাত্রী ওঠানোর পর মাঝপথে সংঘবদ্ধভাবে পকেটমারের ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু সিএনজি অটোরিকশায় যাত্রী ওঠানোর পর নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে অন্য যাত্রীদের ওঠানো-নামানোর সুযোগে পকেটমাররা যাত্রীদের দুই পাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। বিশেষ করে বন্দরবাজার ও আম্বরখানার দিকে যাওয়ার পথে যাত্রীদের পকেট থেকে টাকা, মোবাইল ফোন কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ।
কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, বন্দরবাজার কিংবা আম্বরখানায় পৌঁছানোর আগেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা সিএনজি থেকে নেমে যান। পরে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে যাত্রীরা পকেটে হাত দিয়ে দেখতে পান, টাকা-পয়সা বা মূল্যবান সামগ্রী নেই।
সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য-
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিবেদক সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ যাত্রী হিসেবে বিভিন্ন রুটে সিএনজিতে যাতায়াত করেন। এ সময় কয়েকটি ঘটনায় যাত্রীদের পকেটে হাত দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায় বলে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এক পর্যায়ে পকেটে হাত দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে সিএনজি থেকে নেমে যেতে দেখা যায়। এতে সিএনজির ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে পকেটমারের একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন।
নারী সদস্য দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ-
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, নগরীর বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, সুরমা মার্কেট, কুদরত উল্লাহ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কিছু সিএনজি চালক যাত্রীদের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অন্যদিকে নিয়ে যান। পরে বিভিন্ন কৌশলে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, এসব ঘটনায় চালকদের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা জড়িত রয়েছেন। ওই চক্রে নারী সদস্য থাকারও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী সদস্যদের ব্যবহার করে যাত্রীদের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, শ্লীলতাহানি কিংবা হয়রানির অভিযোগ তুলে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সচেতন মহলের মতে, কোনো যাত্রীকে তার সম্মতি ছাড়া নির্ধারিত গন্তব্যের বাইরে নিয়ে যাওয়া শুধু হয়রানিই নয়, এটি যাত্রীর নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একইভাবে গণপরিবহনে সংঘবদ্ধ পকেটমার বা প্রতারণার ঘটনা ঘটলে সাধারণ যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারেন।
তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশার চালকদের পরিচয় ও গাড়ির নম্বর সহজে শনাক্ত করার ব্যবস্থা, যাত্রী ওঠানামার ওপর নজরদারি এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সন্ধ্যার পর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সচেতনরা। যাত্রার সময় গাড়ির নম্বর সংরক্ষণ, পরিচিতজনকে গন্তব্য জানানো এবং কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, যাত্রী হয়রানি, পকেটমারি, প্রতারণা ও পরিবহন খাতে অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে নেবে।

এই সংবাদটি 15 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ