সিলেট সীমান্ত এখন চোরাচালানীদের অন্যতম নিরাপদ ট্রানজিট জোন

প্রকাশিত: ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০২৫

সিলেট সীমান্ত এখন চোরাচালানীদের অন্যতম নিরাপদ ট্রানজিট জোন

* অবৈধ পণ্যের চালান থামছে না; সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতি হুমকির মুখে*

ফয়জুল হক শিমুল :
শাহজালালের পুণ্যভূমি সিলেট এখন চোরাচালানীদের স্বর্গরাজ্য। স্বাধীনতার পর থেকে এ অঞ্চল ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে চোরাচালান ও মাদক কারবারীদের অন্যতম নিরাপদ ট্রানজিট জোনে। সরকার বদলালেও চোরাকারবারীদের রমরমা বাণিজ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না— বরং দিন দিন আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে তাদের নেটওয়ার্ক।

সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ— এই চার জেলা জুড়ে বিস্তৃত সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অসংখ্য ফাঁড়ি রয়েছে। ভারত সরকারের নির্মিত কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশের সীমানা আলাদা করেছে বটে, তবে সেই বেড়ার পাশ ঘেঁষে, কাটাতারের বেড়া কেটে প্রতিনিয়তই আসছে ভারতীয় পণ্য, পশু ও মাদকদ্রব্যের চালান।

এক মাসেই বিপুল ভারতীয় পণ্য জব্দ :
গত অক্টোবর মাসেই সিলেট মহানগর পুলিশ জব্দ করেছে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৭ হাজার ৮২০ কেজি পেঁয়াজ, ৩১ পিস কাতান শাড়ি, ৩ হাজার ৭৪৩ পিস চকোলেট, ১ হাজার ৪২৫ পিস মেন্টস রেনবো চকোলেট, ৪ লাখ ২০ হাজার শলাকা ‘নাসিরুদ্দিন বিড়ি’, ৩৬৩ পিস সাবান, ৬৪ পিস কম্বল, ২ হাজার ৭১ পিস শাড়ি, ১ হাজার ৬০০ পিস স্কিন কেয়ার ক্রিম, ৭৭০ প্যাকেট বিদেশি সিগারেট, ৯ হাজার ২১৪ কেজি চা পাতা, ১ হাজার ৪৪০ কেজি কেনু, ৫২ বস্তা জিরা ও ২৬টি মোবাইল হ্যান্ডসেট।

এসব ছাড়াও নিয়মিতভাবে গরু-মহিষ থেকে শুরু করে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য পর্যন্ত আসে এই সীমান্তপথগুলোতে।

সীমান্তে বিজিবির অভিযানেও ধরা পড়ে চালান:
গত শনিবার (১ নভেম্বর ২০২৫) ভোর রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে ১৩টি ভারতীয় গরু আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি)-এর দত্তগ্রাম বিওপির টহলদল ওই অভিযান পরিচালনা করে।
ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল এএসএম জাকারিয়া জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত ৪টার দিকে টহল দল সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালায়। ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় মালিকবিহীন অবস্থায় গরুগুলো আটক করা হয়।

কিভাবে চলে সীমান্তপথে চোরাচালান:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের চোরাকারবারীচক্র কাটাঁতার কেটে নির্দিষ্ট কয়েকটি পয়েন্টে পণ্য পৌঁছে দেয়। ফুলতলা, বুবরথল, লাতু, গজুকাটা, নোয়াগ্রাম, জকিগঞ্জ, সুতারকান্দি, ডাউকি ও আশুগঞ্জ সীমান্ত ফাঁড়ির মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলো এখন চোরাচালানীদের সক্রিয় রুট হিসেবে পরিচিত।
সূত্রে প্রকাশ, একসময় এসব চালান নদীপথে আসত। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ায় বর্তমানে স্থলপথই চোরাচালানীদের কাছে বেশি নিরাপদ। ভারত থেকে জকিগঞ্জের মুন্সিবাজার, বড়লেখার বুবরথল, কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গলের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট কারবারীরা পণ্য সংগ্রহ করে।
ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অদৃশ্য সাম্রাজ্য :
প্রতি মাসে কয়েক কোটি বিড়ি আসে ভারত থেকে, যার প্রমাণ অক্টোবর মাসেই মহানগর পুলিশের হাতে আটক হয় ৪ লাখ ২০ হাজার শলাকা বিড়ি। ইয়াবার চালান আসে অর্ধকোটি ট্যাবলেটেরও বেশি। সূত্র জানায়, একজন বড় ইয়াবা ব্যবসায়ী প্রতি চালানে ১ লাখ ইয়াবা ক্রয় করতে হয় । ১ লাখ ক্রয় করলে প্রতি ট্যাবলেটের দাম পড়ে ৬০ টাকা। কাস্টমার পর্যন্ত পৌঁছে প্রতি পিছ ২০০ টাকা। আর সিলেট অঞ্চলে সক্রিয় এমন ব্যবসায়ী রয়েছেন শতাধিক।

প্রায় প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে অন্তত একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেই ভারতীয় চোরাকারবারীরা কাটাঁতার কেটে তাদের পণ্য বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করায়। বাংলাদেশে টহল এড়াতে ঘুষ ও মাসোহারা দেয়ার ঘটনাও নিয়মিত। কখনো কখনো টাকার লেনদেনে দ্বন্দ্ব হলেই নিজেদের চক্রের সদস্যদের ধরিয়ে দেয় পুলিশে।

চোরাকারবারীদের নিরাপদ আশ্রয় সিলেট :

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট ও মৌলভীবাজার , হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ জেলার গ্রামীণ বাজারগুলোতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় বিড়ি ও কসমেটিকস পণ্য। অনেক দোকানে স্থানীয় পণ্যের তুলনায় ভারতীয় পণ্য বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুল পণ্য জব্দ হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রবিবার (৩ নভেম্বর) রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, চোরাচালান বিরোধী তৎপরতা আরও জোরদার করবেন।
“যদি এক মাসেই এত পরিমাণ চোরাচালান ধরা পড়ে, তবে অদৃশ্যভাবে এর বহর কতো বিশাল তা সহজেই অনুমান করা যায়।”

সীমান্তবর্তী সিলেট ও আশপাশের জেলাগুলো এখন কার্যত চোরাকারবারীদের ‘স্বর্গরাজ্য’। সীমান্ত ফাঁড়ি, পাহাড়ি বনাঞ্চল ও গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করছে ভারতীয় পণ্য ও মাদকদ্রব্য। এই চোরাচালান শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সামাজিক নিরাপত্তাকে ও যুব সমাজ হুমকির মুখে ফেলছে।
চোরাকারবার দমনে কঠোর নজরদারি, সমন্বিত অভিযান ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।

এই সংবাদটি 182 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ