সিলেটে ভূমিকম্পের ঝুঁকি,বাড়ছে বহুতল ভবন

প্রকাশিত: ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬

সিলেটে ভূমিকম্পের ঝুঁকি,বাড়ছে বহুতল ভবন

ফয়জুল হক শিমুল, সিলেট:
ভূমিকম্পের ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল সিলেট। একদিকে সক্রিয় ভূ-চ্যুতি বা ফল্ট লাইনের অবস্থান, অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে বহুতল ভবন। কিন্তু এসব ভবনের কতটি ভূমিকম্প সহনীয়, কতটি নির্মাণ করা হয়েছে অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে—তা নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট সীমান্তের কাছে রয়েছে সক্রিয় ডাউকি ফল্ট। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে সিলেটকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে মুক্ত বলা যায় না। ইতোমধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের জন্য ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্রও তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প নিজে যতটা না প্রাণহানির কারণ, তার চেয়ে বড় বিপদ তৈরি করে দুর্বল ও অপরিকল্পিত ভবন। সিলেট নগরীতে দ্রুত বাড়ছে আবাসিক ভবন, মার্কেট ও বাণিজ্যিক স্থাপনার উচ্চতা। কিন্তু পুরোনো অনেক ভবনের পাশাপাশি নতুন ভবনগুলোর নির্মাণমান ও ভূমিকম্প সহনশীলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ বলেন, সিলেট নগরীর প্রায় ৪২ হাজার ভবনের অধিকাংশই পুরোনো ও দুর্বল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভবন নির্মাণে নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে মানা হয়নি এবং মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও এসব ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সিলেট নগরীতে আগেই বেশ কিছু ভবন ও স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০১৯ সালের জরিপে ২৪টি স্থাপনার তালিকা করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, তালিকায় থাকা কিছু ভবনে রং পরিবর্তন করে আবারও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে। নগরীর সুরমা মার্কেট,
জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন ও মিতালী ম্যানশনের মতো পুরোনো বাণিজ্যিক ভবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও এসব স্থাপনায় কার্যক্রম চলার বিষয়টি নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শুধু পুরোনো ভবন নয়, নতুন বহুতল ভবন নিয়েও প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। ভবনের নকশা, মাটির ধারণক্ষমতা, ভিত্তির গভীরতা, নির্মাণসামগ্রীর মান, কলাম-বিমের নকশা এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় ভূমিকম্পের সময় ভবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
সম্প্রতি সিলেটে ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার পর নগরীর একটি ভবন হেলে পড়ার খবরও সামনে আসে। পরে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ ভবনটির নকশা ও অনুমোদনের কাগজপত্র চেয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—সিলেটের প্রতিটি বহুতল ভবনের কি ভূমিকম্প সহনশীলতা পরীক্ষা করা হচ্ছে? অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ হচ্ছে কি না, নির্মাণের সময় প্রকৌশলীদের তদারকি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, আর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত হওয়ার পর সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযান চালানোর চেয়ে আগে থেকেই ভবনগুলোর ঝুঁকি নিরূপণ এবং দুর্বল ভবন সংস্কার বা অপসারণ করা অনেক বেশি কার্যকর।
সিলেট সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে—নগরীর বহুতল ভবনগুলোর একটি সমন্বিত ভূমিকম্প ঝুঁকি নিরূপণ, ভবনের বয়স ও নির্মাণমান অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
কারণ ভূমিকম্প কখন হবে, তার সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একটি ভবন ভূমিকম্পের সময় মানুষের জীবন রক্ষা করবে, নাকি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে—সেটি অনেকাংশেই নির্ভর করে ভবনটি কীভাবে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে তার ওপর।
সিলেটে তাই প্রশ্ন একটাই—ভূমিকম্প আসার আগে কি আমরা প্রস্তুত, নাকি বড় দুর্যোগের পরই শুরু হবে দায় ঠেলাঠেলি?

এই সংবাদটি 26 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ