প্রতিবন্ধকতা হার মানে সামাদের শ্রমে

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬

প্রতিবন্ধকতা হার মানে সামাদের শ্রমে

বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি :

মুখে কোনো কথা নেই, একটি হাতও স্বাভাবিক নয়। তবু থেমে নেই বিয়ানীবাজারের আব্দুস সামাদের জীবন। প্রতিদিন সকাল হলেই ছুটে আসেন বারইগ্রাম বাজারে। কারও পানি প্রয়োজন, চায়ের অর্ডার পৌঁছানো, মাছের বালতি-ঝুড়ি আনা-নেওয়া কিংবা দোকানের ছোটখাটো কাজ—বাঁকা হাত নিয়েই সবকিছু করার চেষ্টা করেন তিনি।

বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বারইগ্রাম গ্রামের মৃত আব্দুল গণির বড় ছেলে সামাদ। বয়স প্রায় ৩০ বছর। জন্মগতভাবে বাক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী তিনি। প্রায় ১২ বছর আগে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্বও অনেকটা তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। নিজের স্ত্রী ও দেড় বছর বয়সী কন্যাসন্তানের পাশাপাশি পরিবারের প্রতিও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

প্রায় এক দশক ধরে বারইগ্রাম বাজারই তাঁর কর্মস্থল। মাছ ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা, পানি ও চা পৌঁছে দেওয়া, মালামাল আনা-নেওয়া এবং বাজার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তিনি। পাশাপাশি পলিথিন বিক্রি করেও আয় করেন। দিনে কত টাকা আয় হয়, তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই; কাজের ওপরই নির্ভর করে তাঁর উপার্জন।

কথা বলতে না পারায় ইশারা-ইঙ্গিতেই নিজের প্রয়োজন বোঝান সামাদ। তবে তাঁর কর্মই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় ভাষা। কারও কাছে হাত পেতে নয়, নিজের শ্রমে বাঁচতে চান তিনি।

মাছ ব্যবসায়ী সেলিম উদ্দিন বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে সামাদ বাজারের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছেন। কথা বলতে না পারলেও কাজের প্রতি তাঁর আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। বাজারের সবাই তাঁকে ভালোবাসেন এবং সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন।

ফল ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান বলেন, সামাদ নিজের মতো করে পরিশ্রম করে আয় করেন। মানুষের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করায় ব্যবসায়ীরাও তাঁকে সাধ্যমতো টাকা দেন।

স্থানীয় সংবাদকর্মী জয়নুল ইসলাম বলেন, “আব্দুস সামাদ কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনসংগ্রামকে থামাতে পারেনি।”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সামাদ সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তাঁর স্ত্রী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরিবারের আরেক সদস্য ছোট ভাইও মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। ফলে সামাদের উপার্জন পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব কষ্টের মধ্যেও সামাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তাঁর ছোট্ট মেয়েকে ঘিরে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি।

সামাদের জীবন করুণার গল্প নয়; এটি আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের গল্প। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু সহায়তার মানুষ হিসেবে নয়, তাঁদের সক্ষমতা অনুযায়ী কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন উপযুক্ত কর্মসংস্থান, সহায়ক পরিবেশ ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।

মুখে কথা নেই সামাদের। কিন্তু প্রতিদিনের শ্রম যেন তাঁর হয়ে বলে—“প্রতিবন্ধকতা আমার শরীরে, আমার স্বপ্নে নয়।”

এই সংবাদটি 14 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ