বেড়ায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যমুনা নদীর ভাঙনরোধ প্রতিরক্ষা বাঁধের তিন কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ

প্রকাশিত: ১:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০১৭

বেড়ায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যমুনা নদীর ভাঙনরোধ প্রতিরক্ষা বাঁধের তিন কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ

পাবনা ব্যুরো অফিস :
পাবনার বেড়ায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যমুনা নদীর স্থায়ী ভাঙনরোধ প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিরক্ষা বাঁধের টপ কয়েক জায়গায় ৩-৪ ফুট করে দেবে গেছে। প্রতিরক্ষা বাঁধের কোল ঘেষে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন, সিসি ব্লক চুরি ও ধবসে যাওয়ায় বাঁধের মাটি বের হয়ে গেছে। ফলে আগামী বর্ষায় মওসুমে প্রচন্ড ঘূর্ণায়মান স্রোতের টানে ও ঢেউয়ের আঘাতে এসব স্থানে মারাত্মক ভাঙন দেখা দেবে বলে নদী পাড়ের বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
নদী ভাঙন প্রতিরক্ষা বাঁধটি ঘুরে দেখা যায়, বেড়ার মোহনগঞ্জ এলাকায় ৩টি পয়েন্টে নদী ভাঙন প্রতিরক্ষা বাঁধের টপ ৮ ফুট দৈর্ঘে ২ থেকে ৩ ফুট করে দেবে গেছে। সিসি ব্লক আলগা হয়ে পড়েছে। মোহনগঞ্জের ভাটিতে মালদাহপাড়ায় ২টি পয়েন্টে ১০ ফুট ধৈর্ঘে ৫ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত বাঁধের টপ দেবে গেছে। এর সামান্য দুরে বাঁধের টপ থেকে স্লোপের নিচ পর্যন্ত প্রায় ৫০ ফুট এলাকা জুড়ে ব্লক চুরি হয়ে যাওয়ায় মাটি বেড়িয়ে পড়েছে। প্রতিরক্ষা বাঁধের নিচে নদীতে ফেলা সাপোটিং ব্লক অনেক জায়গা থেকে চুরি হয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ ও মালদাহপাড়ায় প্রতিরক্ষা বাঁধের সাথে লাগানো দুটি ইট ভাটার লোড ট্রাক চলাচল করছে। ট্রাকের ঝাঁকুনিতে প্রতিরক্ষা বাঁধের সিসি ব্লক ধ্বসে পড়ছে। নাকালিয়া বাজার পয়েন্টে সিসি ব্লক ধ্বসে গেছে। এছাড়া মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাঁধের কোল ঘেষে বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি বোমা মেশিনের (দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রেজার) সাহায্যে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর যে স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তার চার পাশের এলাকা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রতিরক্ষা বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষা মওসুমে যমুনা নদীর মুল ধারাটি সরাসরি মোহনগঞ্জ ও মালদাহপাড়ায় আঘাত করে। আগামী বর্ষা মওসুমের আগে প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টগুলো সংস্কার না করা হলে স্রোতের টানে ও ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
এলাকাবাসী জানায়, ১৯৯৭ সালে বেড়া মোহনগঞ্জ থেকে কাজীরহাট পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যমুনা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়। সহস্রাধিক বসতভিটা, ফসলী জমি, হাটবাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ মন্দির নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ওই বছরের ২৭ এপ্রিল নাকালিয়া নামকস্থানে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ যমুনা নদীতে ভেঙ্গে প্রকল্প অভ্যন্তরে পানি প্রবেশ করে। পানির প্রচন্ড স্রোতের টানে প্রকল্প অভ্যন্তরে দুই যুগ ধরে গড়ে ওঠা গ্রামীন অবকাঠামো ৮টি ব্রীজ কালভাটর্, কাঁচা-পাকা সড়ক, প্রায় ৫ হাজার একর জমির উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পানির তোড়ে ১২টি বাড়ীঘর ভেসে যায়। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০০০ সালে এক জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাবনার বেড়ায় গত ৪০ বছরের অব্যাহত নদী ভাঙনে যমুনা ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরে এসেছে। এ সময়ে যমুনার ভাঙনে ৭২টি গ্রাম, ১০ হাজার একর ফসলী জমি, ১২টি হাট-বাজার, ৩৫টি স্কুল-মাদ্রাসা, ১৫টি মসজিদ মন্দির, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। এরমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অন্য এলাকায় বাড়ী করেছে, সহায়-সম্বল হারিয়ে ১৫ হাজার মানুষ বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। নদী ভাঙনে ভূমিহীন হয়ে ৫ হাজার মানুষ শহরে বস্তিবাসী হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে যমুনা নদী স্থায়ী ভাঙন রোধের সুপারিশ করা হয়। এই সুপারিশের আলোকে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার বেড়ার মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার যমুনা নদীর পশ্চিম তীর স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্প হাতে নেয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ২০০৪ সালে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা-মেঘনা রিভার ইরোশন মিটিগেশন প্রকল্পের আওতায় যমুনা নদীর সবচেয়ে বেশি ভাঙন প্রবণ পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ থেকে রাকশা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী স্থায়ী ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ ২০০৪ সালে শুরু হয়ে ২০০৮ সালে শেষ হয়। প্রায় ১৩ কিলোমিটার যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে (ডানতীর) প্রতিরক্ষ বাঁধ তৈরি করা হয়। প্রতিরক্ষ বাঁধ নির্মানের ফলে মোহনগঞ্জ থেকে রাকশা পর্যন্ত যমুনা নদীর ভাঙ্গন বন্ধ হয়ে যায়। নদীর পশ্চিম পাড়ে চর জেগে উঠতে থাকে। এই কাজে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরন না করে গ্লোবাল পজিশনিং (জিপিএস) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
সফলভাবে গ্লোবাল পজিশনিং (জিপিএস) পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্থায়ী ভাঙনরোধ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করায় গত ১০ বছর বেড়াবাসী যমুনা নদী ভাঙনের তান্ডবলীলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। এরফলে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, কৈটোলা পাম্পিং ষ্টেশনসহ ৩০টি গ্রাম ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। এতে যমুনা নদী তীরবর্তী এলাকাবাসীর মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কার না করা, সিসি ব্লক চুরিসহ যমুনা নদীর পাড় ঘেষে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে যমুনা নদী তীরবর্তী ৫টি গ্রামে আবারো ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বিভাগের কৈটোলা নির্মাণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সমূহ সার্ভে করা হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায় নাই। আগামী অর্থ বছরে টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সংস্কার কাজ করা হবে। এলাকার মানুষের মাধ্যে গণসচেতনা সৃষ্টি ছাড়া ব্লক-জিও ব্যাগ চুরি ও প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতিসাধন ঠেকানো সম্ভব নয় বলে তিনি জানান

এই সংবাদটি 470 বার পঠিত হয়েছে