ফেসবুকে ডাক্তার তুহিন এর স্ট্যাটাস- আমি একজন বাবা, একজন সন্তান ও একজন ভাই বলছি…

প্রকাশিত: ৮:৫৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২০

ফেসবুকে ডাক্তার তুহিন এর স্ট্যাটাস- আমি একজন বাবা, একজন সন্তান ও একজন ভাই বলছি…

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বে মহামারি দেখা দিয়েছে। এর আঁচ লেগেছে আমাদের সবুজ-শ্যামল এ বাংলাদেশে। সোমবার পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ৩জনের ও ৩৩ আক্রান্ত হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় করোনা শনাক্ত করার সুযোগ থাকলে (স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক সপ্তাহের মধ্যে আরো একটি করোনা শনাক্ত ল্যাব স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন) এ সংখ্যা হয়তো আশংকাজনকভাবে বাড়তো! দেশের এই ক্রান্তিকালে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের প্রতি নিজের দায়বোধ ও দায়িত্ব নিয়েই আবেগ প্রবন ও বাস্তব একটি স্ট্যাটাস দিলে ডা, শাহিদ তুহিন।

আমি একজন বাবা, একজন সন্তান ও ভাই হিসেবে বলছি-

আমি সাহাল ইবনে শাহিদ এর বাবা। এটা আমার জীবনের অনন্য সুখকর একটা পরিচয়। ২৩৪ দিন বয়সী আমার ভালোবাসার ফুল তার বাবাকে অল্প কয়দিনই কাছে পেয়েছে। তার সুন্দর জীবনের জন্য বাবাকে তার খুব প্রয়োজন। বাবার রাজপুত্র হয়ে বাবার স্নেহের বটবৃক্ষের ছায়ায় সে বড় হতে চায়। বাবার হাত ধরে সে আগাতে চায় সুন্দর জীবনের পথে।

আমরা চিকিৎসকরা মানুষের জন্য নিজ জীবন স্যাক্রিফাইস এর ব্রত নিয়েই এই পেশায় এসেছি। আমাদের পেশাটি মানবিক। হ্যাঁ জীবনের পথের ব্যয় নির্বাহ করতে এবং পরিবার ও সংসার এর দায়িত্ব পালনে আমাদেরও টাকার দরকার হয়।কিন্ত আমাদের আত্মিক সুখের জায়গা হলো একজন অসুস্থ মানুষ এর সুস্থতার হাসি।। একজন মরণাপন্ন মানুষ যখন মৃত্যুর খুব কাছ থেকে জীবনের আলোতে ফিরে আসে, তখন আমরা কতটা সুখ পাই, আনন্দিত হই তা বুঝানো যাবেনা।

আমরা দেশের এই চরম সংকটে দায়িত্ব এড়াতে চাইনা। গত বছর ডেঙ্গু সীজনেও অনেক চিকিৎসক মারা গিয়েছেন কিন্ত এই রাষ্ট্র কি তাদের ন্যুনতম সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছে??

আপনারা আমাদের কসাই বলে গালি দেন।
হ্যাঁ আমাদের অনেকে সেই গালি অর্জন করে নেই তা অস্বীকার করবো না।
কিন্ত আপনাদের চরম বিপদের দিনে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আমরাই থাকি আপনাদের পাশে।।

আমি ১২/১৪ জন মানুষের একটা পরিবারের সব ব্যয় নির্বাহ করি।। বাবা মায়ের মাসে ওষুধই লাগে প্রায় ১০০০০ টাকা। অভাবের দিনগুলি পেরিয়ে মা বাবা ভাই বোন পরিবার ও নিজ সন্তানকে সুন্দর জীবন দিতে আমি বিগত ৮/৯ বছর নীরবে প্রায় ২৪ ঘন্টা কাজ করে যাচ্ছি।
আমাদের জমি নাই, ফ্লাট নাই, গাড়ি বাড়ি নাই, ব্যাংকে ১০ লাখের উপর লোন।। আজ আমি মারা গেলে আমার পুরো ফ্যামিলি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
যেই স্বপ্নের পথে হেঁটে এত অধ্যাবসায় ও ত্যাগ করে এতদূর পথ পাড়ি দিয়েছি, তা আবার ‍শূন্যতায় ভরে যাবে।

আমি আমার মা বাবার স্বপ্ন পূরণের কমরেড। আমাকে হারালে আমার মা বাবা পথে নেমে আসবেন।

চিকিৎসক হিসেবে আমি যেমন আমার দায়িত্বের প্রতি যত্নশীল ও আন্তরিক, তেমনই পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি আমার মা বাবা, ভাই বোন ও সন্তানের কাছেও দায়বদ্ধ।। এই দায় আমি এড়াতে পারিনা কোনভাবেই।

দিনশেষে পরিবারই আমাদের শেষ ঠিকানা। শেষ আশ্রয়।

আমি এক যুগ ধরে চিকিৎসা দিচ্ছি। লাখো মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর কারিগর আমি। কিন্ত আজ আমি আতংকিত। আমার তো আতংকিত হবার কথা ছিলোনা। কারণ আমি যোদ্ধা। করোনা ভাইরাসের মত মরণঘাতী ভয়ংকর অচেনা শত্রুর মুখোমুখি হয়ে লড়ে যাবার অদম্য সাহস আমার আছে।

আমার ভয় আমার পরিবার।
আমার ভয় আমার সন্তান।
আমার ভয় আমার বৃদ্ধ মা বাবা।
তাদের জন্যই আমি এখন মরে যেতে প্রস্তুত নই। দেশের হাজার হাজার চিকিৎসক এর জীবনের গল্পটা আমার মতই।আমাদের দেশের চিকিৎসকরা অরক্ষিত। আমাদের কোন নিরাপত্তা নাই।ইতিমধ্যে একজন চিকিৎসক আইসিইউতে জীবন মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।কয়েকজন চিকিৎসক কোয়ারান্টাইন।।

আমাদের নিরাপত্তার জন্য কতজন আওয়াজ তুলছেন? যেই মানুষগুলো আপনার জন্য লড়বে, সেই মানুষগুলোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য আপনি চুপ থাকতে পারেন, এমন স্বার্থপর আপনাকে আমি ভাবিনা।

তাই আওয়াজ তুলুন। ডাক্তারদের সুরক্ষা সবার আগে। কভিড ১৯ এর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একজন চিকিৎসক যদি SUPER SPREADER হয়ে উঠেন, তাহলে আপনিও আর সুরক্ষিত থাকবেন না।

একটা উলঙ্গ সমন্বয়হীনতা দেখছি আমরা। এখন উচিৎ অতীত ভুলে নতুন করে একটি পরিকল্পনা গ্রহন করা।

আমি সহ দেশের সকল সরকারি বেসরকারি চিকিৎসককে, স্বাস্থ্য কর্মীদের পিপিই দেওয়া হউক। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হউক।

আর হ্যাঁ আপনাকেই বলছি। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো এই ভাইরাসের বিস্তার আপনিই রুখে দিতে পারেন। বাড়িতে অবস্থান করুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। বারবার হাত ধুতে থাকুন। হাত না ধুয়ে মুখ চোখ ও নাক স্পর্শ করবেন না। হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি করবেন না। হাঁচি ও কাশি হলে টিস্যু ইউজ করুন। গণ পরিবহন ও গণ জমায়েত এড়িয়ে চলুন। সচেতন হউন।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ফ্লু নিয়ে হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনি একজন সুপার স্প্রেডার হয়ে উঠে হাজারো মানুষের কান্না ও মৃত্যুর কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকুন। আতংকিত হউন। আতংকিত হয়ে বাসায় অবস্থান করুন।

সবশেষে আকাশ ও জমিনের মালিক মহান রবের নিকট প্রার্থনা করুন। (ডাঃ জুবায়ের ভাই এর অনুকরনে লিখা, আমি জানি প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মী মনে এই চিন্তা কাজ করছে)।

এই সংবাদটি 697 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ