আদর্শ পরিবার গঠনে পিতার ভূমিকা

প্রকাশিত: ১:৪৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৯, ২০১৭

আদর্শ পরিবার গঠনে পিতার ভূমিকা

এম এ সাইদ (তন্ময়) : রাজশাহী বিভাগীয় চীফ:

আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সবকিছু পরিচালনার জন্য নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিয়ম মেনে নিজ নিজ কপথে চলে। এর ব্যত্যয় ঘটলে পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আমাদের জীবনের উন্নতি সাধন করতে হলে সকল প্রকার কাজকর্মে আল্লাহ তাআলার নির্দেশগুলো অবশ্যই সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে, নতুবা নিজেও ধ্বংস হব, পরিবার এবং জাতিও ধ্বংস হবে।
ইসলামে পরিবার হচ্ছে গোটা সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক। সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সঠিক ভূমিকা পালনের মৌলিক শিক্ষা লাভ করা হয় পারিবারিক পরিবেশে। রাসূল সা.-এর আদর্শে সন্তান-সন্ততির প্রতি সদাচরণের মাধ্যমে যে আদর্শ পরিবার গড়ে ওঠে, তার সীমা পৃথিবীতেই শেষ হয়ে যায় না, বরং আখেরাতের অসীমকাল পর্যন্ত তা বিস্তৃত। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার ওয়াদা ‘আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে।’ (সূরা তূর: ২১)
এই পারিবারিক জীবনের উন্নতি একটি নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের সকল সদস্যের দায়িত্ব সমান থাকে না। পরিবারের প্রধানের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সাধারণত একটি পরিবারের প্রধান পিতা হয়ে থাকেন। একটি আদর্শ পরিবার গঠনে ও সন্তানদেরকে আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে পিতার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। এই দায়িত্বে যাদের অবহেলা আছে, তারা কিয়ামতের দিন জবাব দিতে পারবে না। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেককে নিজ দায়িত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হবে।’(বুখারী শরীফ, হাদীস-৮৪৪) পিতা তার সন্তানের সন্তানের তবাবধায়ক এবং পিতাকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হবে।
অভিভাবকদের প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং পরিবারবর্গকে দোযখের আগুন হতে রা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সূরা ৬৬ তাহরীম, আয়াত-৬)। অভিভাবক সকলের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে সবার প্রতি। ছেলে-মেয়ের বেড়ে ওঠা, তাদের শারিরিক ও মানসিক গঠন সুন্দর করার প্রতি মমতার দৃষ্টি রাখতে হবে। ছোট থেকেই তাদেরকে আদব-আখলাক শিক্ষা দিতে হবে। নামায-কালাম, বড়দের সাথে সুন্দর ব্যবহার ইত্যাদির তালিম দিতে হবে। একটি শিশুর সর্বপ্রথম বাক্য যেন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। রাসূল সা.-এর হাদিস অনুযায়ী প্রত্যেক শিশু যখন কথা বলতে শেখে, তখন তার মুখে কালেমা উঠিয়ে দেয়া উচিত। ছড়া-গান, ডগ-ক্যাট ইত্যাদি না শিখিয়ে কলেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ শিক্ষা দেয়া উচিত। যেই আল্লাহ তাকে এই সুন্দর পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তার পরিচয় অবহিত করা উচিত। আলিফ, বা, তা, ছা ইত্যাদি শিক্ষা দেয়া সর্বপ্রথম দায়িত্ব।
শিশু-কিশোরদের মন অত্যন্ত কোমল ও পবিত্র। তাদের মনে যদি কোন বস্তু (ভাল-মন্দ) স্থান করে নেয়, তা তাদের ভবিষ্যত জীবনেও থেকে যায়। তাই শিশু-কিশোরদের সাথে কখনো খেলার ছলেও মিথ্যা বলা বা প্রতারণা করা ঠিক নয়। রাসূল সা. শিশু-কিশোরদের সাথে সরল-সত্য ও স্নেহময় ব্যবহার করেছেন এবং আমাদেরকেও করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল সা. রসিকতার মধ্যেও সত্য কথাটি বলতেন। বুড়ির জান্নাতে না যাওয়ার মত ঘটনা তার প্রমাণ বহন করে। তাই প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত, শিশুদেরকে সত্য ও আদর্শ শিক্ষা প্রদানের জন্য জীবনের শুরু থেকেই তাদের সাথে সাবধানে কথা বার্ত বলা।
আমরা যদি আমাদের শিশুদেরকে রাসূল সা.-এর আদর্শ অনুসরণে আদর্শবান ও সৎচরিত্রবান করে গড়ে তুলি, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মকে তারা তাদের মত করেই গড়ে তোলার প্রয়াস পাবে। এ ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠতে শুরু করবে সুন্দর, শান্তিময় ও আদর্শ পরিবার। যার ফলে আমরা আবার ফিরে পাবো আমাদের হারানো নৈতিক মূল্যবোধ, আদর্শ, তাহযীব, তামাদ্দুন, কৃষ্টি, ব্যক্তিত্ব তথা সব কিছু। মুক্তি পাবো পাপ-পঙ্কিলতা, অশান্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুন্ঠন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, হানাহানি-কাটাকাটি, মারামারি ইত্যাদি জাহিলিয়াতের অন্ধকার যুগের ঘৃণ্য রীতি-নীতির বিষাক্ত ছোবল থেকে।
আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে টেলিভিশন আর ডিশ অ্যান্টিনায় অশ্লীল ছবি দেখে দেখে। হাতে হাতে মোবাইল তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখান থেকে শিখছে খুনখারাবি, সন্ত্রাস, রাহাজানি, অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা, ইভটিজিংসহ ভয়াবহ সব অশ্লীল ও জঘন্য অপরাধ। আর তা শিখছে মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে বসে। এসব অপকর্মের জন্য দায়ী কে? নিশ্চয়ই তার অভিভাবক। আমরা আমাদের শিশুদের সেই শিক্ষা দিচ্ছি না, যা মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, প্রিয় নবী সা. আমাদের শিখিয়েছেন।
আপনার-আমার সন্তান আগামী দিনের ভবিষ্যত। মানুষ ও সমাজের রাহবার। চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে সে সত্যের আলো ছড়াবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। অন্ধকার সমাজে জ্বালবে মুক্তির আলো। পথভোলা ও দিকভ্রান্ত মানুষকে দেখাবে সত্যের পথ, মুক্তির পথ। হতাশায় ডুবন্ত জাতিকে তুলে আনবে আশার আলোর রঙিন ঠিকানায়। কিন্তু আমরা অনেক সময় আদর করে তাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেই আমাদের অজান্তেই। ‘বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে’ এমন নীতিবাক্য আওড়াতে দেখা যায় অনেককে। কিন্তু বড় হয়ে যখন নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন আফসোস করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। আমার সন্তান মোবাইলে-কম্পিউটারে গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে কি না, সেদিকেও আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কোন অসৎ সঙ্গির কারণে খারাপ পথে পা বাড়াচ্ছে কি না, তাও তদারকি করতে হবে।
সন্তানের সুন্দর ও আদর্শ জীবন গঠনে পিতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। পিতা-মাতা যেভাবে তাকে গড়ে তোলেন, সেভাবেই তারা গড়ে ওঠে। সন্তান সর্বপ্রথম পিতা-মাতাকে অনুসরণ করে। পিতা-মাতা কী করে, কী বলে, সে ঐভাবে করতে ও বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সে কারণে প্রত্যেক পিতা-মাতাকে সন্তানের সামনে সুন্দর আচার-আচরণ উপহার দিতে হবে ও তাদের আদর্শ জীবন গঠনে পদপে নিতে হবে। যার মাধ্যমে ঐ শিশু বড় হয়ে কখনো পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না এবং উচ্ছৃক্সখল জীবনযাপনে নিজেদের জড়াবে না। পরিবার তখন হবে আদর্শ। পরিবেশ হবে জান্নাতী।
সন্তানকে ছোট থেকেই নামাযের প্রশিণ দিতে হবে। মহানবী সা. বলেছেন, ‘যখন তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হয়, তখন তাদেরকে নামাযের আদেশ দাও। দশ বছর হলে প্রয়োজনে প্রহার কর। আর এ বয়সে এসে তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (মেশকাত শরীফ, হাদীস-৫৭২) পিতা যদি সন্তানকে নামাযী বানিয়ে যায়, তাহলে মৃত্যুর পর সেই সুসন্তানের ইবাদত-বন্দেগীর কারণে কবরেও সাওয়াবপ্রাপ্ত হবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া। তার মধ্যে উলেখযোগ্য হলো সৎ চরিত্রবান ও নামাযী সন্তানের দুআ। (মুসলিম শরীফ, হাদীস-৩০৮৪) এসব গুরুত্বের কারণে রাসূল সা. প্রত্যেক অভিভাবককে নির্দেশ দিয়েছেন, সাত বছর বয়স থেকেই সন্তানদের নামাযের আদেশ দিতে। এরপর দশ বছর বয়সেও যদি নামায না পড়ে তাহলে মৃদু প্রহার করে হলেও এ কাজ আদায় করতে। যে সন্তানকে তার অভিভাবক ছোটবেলা থেকে নামাযে অভ্যস্ত করতে সম হয়েছেন, প্রাপ্ত বয়সে তারা কখনোই ছিনতাই-চাঁদাবাজি, অপহরণ, লুণ্ঠন, চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি ও মানব বিধ্বংসী কোনো গর্হিত কাজে জড়াতে পারে না। কেননা, কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় নামায মানুষকে সব ধরনের অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা ২৯ আনকাবুত, আয়াত-৪৫) নামাযের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন যাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের পুতপবিত্র আখলাক-চরিত্র, আদব ও ভদ্রতা শিক্ষা দিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আদর্শ পরিবার ও আদর্শ সন্তান গঠনের তাওফীক দান করুন। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করার মানসিকতা দান করুন। প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

এই সংবাদটি 2311 বার পঠিত হয়েছে