ঋতু কন্যা যেন সকলকে কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে দিল। বাংলার হাওর বাওর, বিলঝিল, নদীনালা সহ মাঠের অবারিত প্রান্তর দখলে নিয়েছে পরিযায়ী দল। নিরাপদ ঐ আশ্ররয়গুতে ভিড় জমিয়েছে দূর দেশের মুক্ত বিহঙ্গরা। তাদের উড়াউড়িতে আর কলতানে মুখর হাওরাঞ্চল। সন্ধাকাশে পালকের শনশন শব্দ গুনিয়ে যায় অতিথি আগমনের অচেনা সুর। গোধূলি পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকা হিজল -বন ও হাওরপারের ঝোপঝাড়। গাছের ডালে ডালে জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় পাখিদের জোর গলায় ডাকাডাকি শুনে মনে হয় নিজের দেশ পরবাসী। শীতের হাড় কাপানো ঠাণ্ডায় হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলো এক সময়ে অতিথি পাখির কলরবে থাকলেও বতর্মানে গ্রামীণ পরিবেশে সেটা যেন দুর্লভ। পরিযায়ী পাখিগুলো রঙ বেরঙের ছোট -বড় অসংখ্য পাখি আমাদের পরিবেশেও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখলেও তাদে প্রতি আমাদের বিরুপ আচরণ বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শীতকালে ভিবিন্ন প্রজাতির পাখির আগমনে পূর্ণতা পায় হাওরাঞ্চল। সৌজন্য বৃদ্ধি ঘটে পরিবেশের। কিন্তু আমরা কি রক্ষা করতে পারছি অতিথি হয়ে আসা এসব পাখিকে? শিকারিরা ফাদ পেতে বা টোপ দিয়ে লুকচক্কুর. অন্তরালে শিকার করছে অতিথি পাখি। পৃথিবীর ভিবিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ আসে অতিথি পাখি। এরা আমাদের বৃহৎ একটি সম্পদ হলেও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে শিকারিদের কবল থেকে মুক্ত হতে পারছে না পাখিগুলো। পরিযায়ী পাখি নিদনের ফলে জীব বৈচিত্র্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের নানাবিধ উপকার করে থাকে পাখির দল। পাখি বিশারদের দাবি, পৃথিবীতে প্রায় আট হাজার ছয়শ প্রজাতির পাখি রয়েছে। ১৮৫৫ প্রজাতিই পরিযায়ী। ৩১৬ প্রজাতির পাখি দুরদেশ থেকে বছরে নানা সময়ে এই দেশে আসে। এদের মধে শিতে আসে প্রায় ২৯০ প্রজাতি আর বাকি প্রজাতিগুলো আসে গ্রিশ্মে। এদেশে পরিযায়ী পাখির ৯৫ শতাংশ আসে শীতকালে। বাকি ৫ শতাংশ আসে বছরের ভিবিন্ন সময়ে তাছাড়া অতিথি পাখিদের বিচরণ ভূমি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। শীতকে সামনে রেখে সাইবেরিয়ায় সহ ভিবিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওয়রে। ভিবিন্ন খাল, বিল পুকুর নদ নদী অববাহিকায় গড়ে তুলে তাদের আবাস। নানা কারনে আমাদের দেশে কমতে শুরু করেছে অতিথি পাখির আগমন। পরিযায়ী পাখি সর্বদা দল বেধে ঝাকে ঝাকে চলে। পরিযায়ী পাখির দলের সামনে থাকে অবিজ্ঞ পাখি পথ চিনিয়ে নেওয়ার জন্য, পিছনেও থাকে অবিজ্ঞ পাখি বেশিরভাগ পাখি ফ্লাইওয়ে গুলো দিয়ে চলাফেরা করে। শীতের পর পরিযায়াী পাখিরা উওরে চলে যা বংশ বিস্তারের জন্য। ইউরোপ আর এশিয়ার প্রায় ৬০০ প্রজাতির অতিথি পাখি রয়েছে। এসব পাখির মঝে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে অতিথি হয়ে আসে প্রতি বছর। প্রতিবারের মত এবার ও আসতে শুরু করেছে তারা দেশের এবারেও প্রচুর পরিমাণ বিদেশী বিচরন লক্ষণীয়। দেশের যে কয়টি স্থানে অতিথি পাখির সমাগম ঘটে তার হাকালুকি হাওর তার মাঝে অন্যতম।
প্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে উপমহাদেশে ২ হাজার ১০০শত প্রজাপতি পাখি আছে। তবে এদের মাঝে প্রায় সাড়ে তিনশ প্রজাতির পাখি হিমালয় পেরিয়ে আমাদের দেশে চলে আসে।
সচরাচর যেসব পাখি আমাদের চোখে পড়ে তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হল, জলময়ুর, ডুবুরী, খুপা ডুবুরী, পানকৌড়ি, শামুক ভাঙা, চ্যাগা, পাতারি হাস, বালি হাস, সরালি, ধুষর বক, সাদা বক, ইংল্যান্ডের নর্থ হেম্পশায়ার, সাইবেরিয়ায় কিংবা এন্টরকটিকার তিব্র শীত থেকে বাসতে এরা পাড়ি জমায় দক্ষিণের কম শীতের দেশে। প্রকৃতিগত ভাবেই এ পাখিদের শরীরের গঠন খুব মজবুত। এরা সাধারণত ৬০০থেকে ১৩০০ মিটার উচু দিয়ে উড়ে যায়। ছোট পাখিদের ঘন্টায় গতি প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। দিনে রাতে এরা প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার উড়তে পারে। বড় পাখিরা ঘন্টায় ৮০ কিলোমিটার অনায়াসে উড়তে পারে। আশ্চর্য লাগে এই পাখি তাদের গন্তব্য স্থান সঠিক _ ভাবে নির্নয় করতে পারে। শখের শিকারিদের গুলিতে শীত মৌসুমে শত শত পাখি প্রায় হারায়। যে পাখিরা প্রতি বছর অতিথি হয়ে আসে এই বাংলাদেশে, তাদের অনেকের পক্ষে শীত মৌসুম শেষ ঘরে ফেরা হয় না কিছু লোভী মানুষের কারনে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই প্রকাশ্যে বিক্রি করা হয় অতিথি পাখি। এক যুগ আগের চেয়ে প্রতি বছর অতিথি পাখির আগমন অনেক কম, তা বিশেষজ্ঞদের অনুমেয়। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে অতিথি পাখি নিধন বন্ধের ব্যাপারে পরিবেশবাদী ও সরকার আইন প্রয়োগ কার্জকরী ভূমিকা পালন করতে হবে।