সাওম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত

প্রকাশিত: ২:১৮ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০১৬

সাওম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন- ‘তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে যেমনি ফরজ ছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (সূরা বাকারা আয়াত-১৮৩)। উল্লিখিত আয়াতে পবিত্র রমজান মাসে আমাদের ওপর সাওম পালনের বিধান আবশ্যকীয় করা সে সঙ্গে তার উদ্দেশ্যও ব্যক্ত করা হয়েছে।

সাওম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। সাওম পালনে যেমনিভাবে ব্যাপক পুণ্য লাভ ও পরকালীন মর্যাদা লাভ হবে তেমনিভাবে রয়েছে ইহকালীন প্রচুর কল্যাণ। এখানে সাওমের ইহকালীন সুফল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল-

* শারীরিক উপকার : নবী (সা.) বলেছেন- ‘সুমু তাসেহু’ অর্থাৎ রোজা রাখ সুস্থ থাক (মুসনাদে আহাম্মদ, তাবরানি)। রাসূল (সা.)-এর এ বাণীটি জার্মানির ডা. ওয়ালারের ক্লিনিকের গেটে লিখে রাখা হয়েছে। যে কোনো প্রাণীর পরিশ্রমান্তে বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। যে কোনো মেশিনকে বিশ্রাম না দিয়ে লাগাতার চালু রাখলে তার আয়ু বা স্থায়ীত্ব কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের পাকস্থলী সারা বছর খাদ্য হজমে কাজ করে যাচ্ছে। পরিপাক তন্ত্র রমজানে দিনের বেলায় কিছুটা বিশ্রাম পায় ফলে তার কর্মশক্তি বৃদ্ধি হয়। সারা বছর খাদ্য গ্রহণের ফলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি মেদ জমে ও কিছু বিষাক্ত টক্সিন জমা হয়। ফলে তা বিভিন্ন রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়। সাওমে বাড়তি মেদ, চর্বি ও বিষাক্ত টক্সিন কমিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। খাদ্য শরীরের অনেক রোগের উৎসকে সহায়তা করে, শরীরে অবস্থিত অনেক রোগ-জীবাণুকে শক্তিশালী করে। এ জন্য দেখা যায় চর্বিযুক্ত খাবার খেলে প্রেসার বেড়ে যায়, জ্বরের রোগী যখন পেটপুরে খাবার গ্রহণ করে তার জ্বর বেড়ে যায়। আমরা যখন উপোস থাকি জীবাণুগুলো উপোস থাকে। আমরা উপোস থেকে কিছুটা দুর্বল হলেও মরে যাব না কিন্তু ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো উপোস থাকতে থাকতে অনেক ধরনের জীবাণু নিঃশ্বেষ হয়ে যায়। মিসরের জাতীয় গবেষণা কেন্দ্রের প্রাণ রসায়ন শিক্ষক ড. আবদুল বাসেত মোহাম্মদ সাইয়্যেদ বলেন যারা ভাবেন, রোজা রাখলে শরীর দুর্বল হয় এবং তাদের নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ জরুরি এটি ভুল ধারণা। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে রোজা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। প্রতিরোধ ক্ষমতা আলফা-১ আলফা-২, বিটা-২ ও গামা নামের প্রোটিন থেকে সৃষ্টি হয়। এ প্রোটিনগুলো রোজার ফলে বৃদ্ধি পায়। এ বৃদ্ধি যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে তা রক্তের শ্বেত কণিকা বৃদ্ধি করে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এমনকি ক্যান্সার সেলকেও প্রতিহত করতে ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে আমরা যদি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে তাকাই তাহলেও রোজা ছাড়া আর কোনো উপায়ে এভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় না। প্রতিরোধ ক্ষমতা বর্ধক ওষুধ দিয়ে এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে কিন্তু তা মানুষের দেহাভ্যন্তরের প্রাথমিক প্রতিরোধ ক্ষমতার মতো হয় না (সূত্র সাপ্তাহিক আদ দাওয়াহ ২১/১১/২০০২, রিয়াদ)। নবী (সা.) বলেছেন দুনিয়া প্রীতি ও লম্বা আশার ব্যাপারে বয়স্কদের হৃদয় অব্যাহতভাবে যুবক (বুখারি)। অর্থাৎ মানুষের আকাঙ্ক্ষা প্রবল, ফলে সে স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ হতে চায় না। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কঠিন। রোজার মাধ্যমে খাদ্য ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ তার সার্বিক কল্যাণই সাধন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কিছু ইঁদুর ও খরগোশের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন। তারা কিছু ইঁদুর ও খরগোশকে পরিমিতি খাদ্য ও কিছুকে প্রচুর খাদ্য দিয়েছেন। দেখা গেছে কম খাদ্য গ্রহণকারীর তুলনায় বেশি খাদ্য গ্রহণকারী ইঁদুর ও খরগোশ অনেক কম আয়ু পেয়েছে। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মিসরের একদল খ্রিস্টান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল দাতব্য চিকিৎসা প্রদানের জন্য মদিনায় এসে ক্যাম্প স্থাপন করে। তারা বেশ কিছু দিন অবস্থান করে ও একেবারে হাতেগোনা কয়েকজন রোগী ছাড়া তাদের কাছে কোনো রোগী আসছিল না। ফলে তারা একজন মুসলিম রাখালকে জিজ্ঞেস করল আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এলাম আমরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণেই কি তোমরা মদিনার মুসলমানরা আমাদের কাছে আসছ না? রাখাল জবাবে বলল ব্যাপারটা তা নয়। আমরা রাসূল (সা.) এর সুন্নত পরিপূর্ণ আমল করি। নবী (সা.) যেভাবে খাবার গ্রহণ করতে বলেছেন, যেভাবে পরিচ্ছন্ন থাকতে বলেছেন সেভাবে আমরা কাজ করি। আমরা নবী (সা.)-এর নির্দেশনা মতো ক্ষুধা পেলে খাবার গ্রহণ করি তবে একেবারে পেট ভরে খাই না। কিছু ক্ষুধা বাকি থাকতে খাবার গ্রহণ বন্ধ করি। ইসলামের এসব নিয়ম মেনে চলার কারণে আমাদের রোগ কম হয়। তাই মদিনায় রোগী কম হওয়ায় তোমরা রোগী পাচ্ছ না। রমজানে খাদ্য কম গ্রহণ করার কারণে দাঁতের ফাঁকে খাদ্য কণা কম জমে ফলে দাঁত সুস্থ থাকে। জিহব্বা থেকে বের হওয়া রস খাদ্য হজমে সহায়ক, সারা বছর এ রস বের হয় কোষগুলো বিশ্রাম পায় না, রমজানে এগুলো বিশ্রাম পেয়ে সবল হয়। পান-তামাকে অভ্যস্ত ব্যক্তি মুখের স্বাদ হারিয়ে ফেলে, রমজানে দিনের বেলায় বিশ্রাম পেয়ে মুখের রুচি বৃদ্ধি হয়। ধূমপায়ীরা রোজা রাখায় রমজানে দিনের বেলায় ধূমপান বন্ধ রাখে, একটু সদিচ্ছা থাকলে এ অছিলায় ক্ষতিকর ধূমপানের অভ্যাস সম্পূর্ণ ত্যাগ করার সুযোগ হয়। তারাবিহ নামাজের রুকু-সেজদা প্রভৃতি হাড়, মাংসপেশি, ফুসফুস, রক্ত চলাচল সব কিছুর উপকার সাধন করে। এক কথায় রোজা মানবদেহের অনেক উপকার সাধন করে।

* মানসিক সুফল : নবী (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি রোজা রেখে অশ্লীল কাজ ও মন্দ কথা ত্যাগ করতে পারেনি তার খাদ্য পানীয় ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (বুখারি ও মুসলিম)।

মন্দ কথা, মন্দ কাজ ও মন্দ চিন্তা থেকে রোজাদারকে বিরত থাকতে হয়। ফলে তার মনমানসিকতা পরিশুদ্ধ হয়। মিসরের হাওয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. সাওয়া রুশদী তার গবেষণায় বলেছেন- কেউ যদি বিভিন্ন কারণে দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হয় তাতে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাঘাত ঘটে। পুরো রমজানে তারাবিহ নামাজ আদায়ে তার মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। রমজানের রূহানি পরিবেশ, তাহাজ্জুদের নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, বিভিন্ন নেক আমল ব্যক্তির মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়।

* সামাজিক সুফল : যাকে সাপে দংশন করেনি সে যেভাবে সর্পবিষের যন্ত্রণা বুঝে না। যে কখনও ক্ষুধার্ত থাকেনি সে ক্ষুধার জ্বালা বুঝবে না। অথচ সমাজে বিত্তশালী যেমনি আছে ক্ষুধার্ত গরিব তেমনই আছে। রমজানে দিনের বেলায় ক্ষুধার্ত থাকার ফলে ধনীদের ক্ষুধার যন্ত্রণা সম্পর্কে ধারণা হয়। ফলে দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। হজরত আবদুল্লা ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- রাসূল (সা.) এমনিতে দানশীল ছিলেন। কিন্তু রমজানে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রবাহমান বায়ুর মতো উন্মুক্ত হস্তে দান করতেন (বুখারি)। নবী (সা.) বলেছেন, রমজানের দান-সদকা সর্বোত্তম (তিরমিজি)। রমজানের এ দান গরিব-দুঃখীর সহায় হয় ফলে সমাজে অভাবীর মুখে হাসি ফোটে। রমজানে সাধারণত জাকাত আদায় করা হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র দূরীকরণে ও দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করে দেয়ায় জাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। দরিদ্রতার কারণে চুরি ছিনতাই ও সমাজে অশান্তি বিরাজমান, দারিদ্র্য দূর হলে সমাজে শান্তি বৃদ্ধি পাবে। রোজা ধৈর্য শিক্ষা দেয়। নবী (সা.) বলেছেন, এটা ধৈর্যের মাস আর ধৈর্যের ফল জান্নাত (ইবনে খোযাইমা)।

সমাজে ঝগড়া-বিবাদ মারামারি হানাহানি আজ মহামারী রূপ নিয়েছে। রোজাদারকে এ ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতে হয়। নবী (সা.) বলেছেন, যদি কেউ রোজাদারের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ বা লড়াই করার উপক্রম করে। রোজাদার ব্যক্তি যেন বলে দেয় ভাই আমি রোজাদার (মিশকাত)। রোজাদারকে সময়মতো খাওয়া, ঘুমানো, সাহরি, ইফতার, তারাবিহ ও অন্যান্য নামাজ আদায় করতে হয়। পুরো এক মাস নিয়মানুবর্তিতার এ প্রশিক্ষণ মানুষকে পরিশ্রমী ও সময়ানুবর্তী করে যা সামাজিক উন্নয়নে সহায়ক। রমজানের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জন। সে তার সব কাজে আল্লাহকে ভয় ও পরকালে জবাবদিহিতার চিন্তা করবে। যেমনই হজরত ওমর (রা)-এর শাসনামলে তিনি গভীর রাতে প্রজাদের অবস্থা দর্শনে বের হয়ে শুনতে পেলেন দরিদ্র কুটিরে মা তার মেয়েকে বলছে দুধে কিছু পানি দেয়ার জন্য যাতে কিছু অর্থ বেশি পাওয়া যায়। মেয়ে মাকে বলছে মা দুধে পানি দেয়া বৈধ নয় খলিফাও এ বিষয়ে নিষেধ করেছেন। তখন মা বলল, আমরা দরিদ্র অভাবী মানুষ একটু পানি দিলে খলিফা তো দেখবেন না। মেয়ে জবাবে বলল, মা খলিফা দেখতে না পেলেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তো দেখতে পাবেন। এভাবে আল্লাহর কথা মনে রেখে আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনাকে তাকওয়া বলা হয়। রমজানের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া শিক্ষা দেয়া। রোজা রেখে তাকওয়া অর্জন করতে না পারলে রোজার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, এ রোজা সত্যিকারে রোজা না হয়ে উপবাস হিসেবে গণ্য হয়। রোজা রেখে তাকওয়া অর্জন করলে সে ব্যক্তিকে বলা হয় মুত্তাকি। আর মুত্তাকি ব্যক্তি কখনও খাদ্যে ভেজাল, খুন, অপহরণ, ধোঁকা দেয়া, ওজনে কম দেয়া ইত্যাদি অন্যায় কাজ করতে পারে না। এভাবে অন্যায় দূর হলে সমাজের সব স্তরে শান্তি বিরাজ করবে, সমাজ উপকৃত হবে। আমরা যেন রোজা রেখে সত্যিকার মুত্তাকি হতে পারি আল্লাহ যেন সে তৌফিক দান করেন।

লেখক : অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা কুমিল্লা

এই সংবাদটি 1015 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ