নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের ভুমিকা

প্রকাশিত: ১১:৩৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০১৮

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের ভুমিকা

তাহের আহমদ

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যে ভুমিকা রেখেছিল। সত্যি তা প্রশসংশার দাবিদার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আন্দোলন করে সফল হয়েছিল। সাম্প্রতিক সড়ক আন্দোলনেও শিক্ষার্থীরা সফল হয়েছে।
নিহত দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছে, তা অতিভূতপূর্ব। এই আন্দোলন আলোকের ঝরনা ধারা, নতুন এক বাংলাদেশ। মূলত গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য বিরাজ করছিল, শিক্ষার্থীরা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তারা এটাও দেখিয়েছে, রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব এবং এটা নিভর্র করে যদি আইনের যথাযোগ্য প্রয়োগ ঘটে। এই সরল কথাটা রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা পর্যন্ত অকপটে স্বীকার করেছেন। শিক্ষার্থীরা বাস, পিকআপ ভ্যান থামিয়ে গাড়ির আর ড্রাইভারের লাইসেন্স আছে কিনা তা পরীক্ষা করেছে এবং উল্টোপথ দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলার সময় আটকে দিয়েছে। যা কোনোদিন ট্রাফিক পুলিশ করতে সাহস পেত না, আমাদের শিক্ষার্থীরা করে দেখিয়েছে। তারা যানবাহনকে সারিবদ্ধভাবে চলতে বাধ্য করেছে। পুলিশ-প্রশাসন কেউই বাদ যায়নি। যাদের লাইসেন্স কিংবা কাগজপত্র ঠিক নেই তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষারর্থীরা মামলা করাতে বাধ্য করেছে। এরপরও যদি পরিবহন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটে তা হলে সেটা হবে জাতির জন্য দুভার্গ্যজনক। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুঘর্টনায় মারা গেছে ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থ্যাৎ প্রতিদিন গড়ে মারা গেছে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছে ৬২ হাজার ৪৮২ জন। গত ১৫ বছরে সড়ক পথে ৫৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৭০ হাজার মামলাও হয়েছে বিভিন্ন দুঘর্টনায়। অন্যদিকে রাজধানীতে বছরে ১৩৫ জনের প্রাণহানি ঘটছে সড়ক দুঘর্টনায়। ৩ বছরে ৬ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন রাজধানীতে। এসব দুঘর্টনা ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। এসব দুঘর্টনায় হতাহত বেশিরভাগ ব্যক্তিই শিশু, তরুণ ও কমর্ক্ষম ব্যক্তি। এদের দুই শ্রেণিকে দেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সড়ক দুঘর্টনায় বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ। জাতিসংঘ উন্নত সড়ক নিরাপত্তার জন্য দীঘির্দন বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে তরুণ মৃত্যুর একটি বড় কারণ সড়ক দুঘর্টনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুঘর্টনায় ২০ হাজার মানুষ মারা যায়। গোড়ায় গলদ রেখে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। কারণ, সারা দেশের ২০ লাখ চালকের মধ্যে ৯ লাখই ভুয়া। ভুয়া অদক্ষ চালক দিয়ে কীভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে সেটাই আমাদের বড় প্রশ্ন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য রাজধানীসহ সারা দেশে ভিড় করছে গাড়ি চালকরা। গাড়ির ফিটনেসের জন্য এক মাস সময় চেয়েছেন মালিকরা। এই দুটো ঘটনার দ্বারা এটাই প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়, গোড়ায় গলদ ছিল। আর এই গলদের কারণেই রাজপথে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককেই। সড়ক দুঘর্টনা কমাতে এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকেই কাযর্কর উদ্যোগ নিতে হবে। আশার কথা যে, সম্প্রতি সরকার আইনসংস্কারসহ নিরাপদ সড়কের জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। দুঘর্টনায় প্রাণহানির সবোর্চ্চ সাজা ৫ বছর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। যদিও প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দুঘর্টনায় দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান অন্তভুির্ক্তর দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারণে দুঘর্টনায় কেউ গুরুতর আহত বা কারও মৃত্যু হলে চালককে সবোর্চ্চ ৫ বছর কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড দেয়া হবে। তবে তদন্তে যদি দেখা যায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন, তাহলে দন্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবে। অথার্ৎ সাজা হবে মৃত্যদন্ড, এক্ষেত্রে তদন্ত সাপেক্ষে এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারা নিধার্রণ করবে। উল্লেখ্য, ফৌজদারি দন্ডবিধিতে সড়কে মৃত্যুর ক্ষেত্রে তিন রকমের বিধান আছে। ওই ঘটনা নরহত্যা হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদন্ড মৃত্যুর বিষয় না হয়ে থাকলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪ (বি) ধারা অনুযায়ী তিন বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু সড়ক দুঘর্টনায় কেউ নিহত হলে সচরাচর ৩০৪(খ) ধারায় মামলা হয় এবং ওই ধারায় মাত্র তিন বছরের জেল হওয়ার কারণে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এবং সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর মধ্যেই সড়ক দুঘর্টনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় গত বছর ৩০৪ ধারায় বাসচালকের যাবজ্জীবন এবং ট্রাকচাপায় এক নারীর মৃত্যুর ঘটনাকে নরহত্যা বিবেচনা করে ৩০২ ধারায় চালকের মৃত্যুদন্ড রায়ের পর ধমর্ঘটে দেশ অচল করে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় পরিবহন শ্রমিকরা। এখানে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে শ্রমিকরা সবসময়ে বেপরোয়া এবং তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করতে চায় না। তাদের ভেতর কোনো রকম অনুশোচনাও নেই। দুঘর্টনার জন্য দায়ী মূলত অবৈধ চালক ও চালকের অসর্তকতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও সড়ক-মহাসড়কের ভঙ্গুর অবস্থা। সারা বছর যেন পথের যাত্রীরা নিরাপদ থাকেন, এ জন্য প্রকৃত অথের্ই সরকার তথা সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষের কাযর্কর উদ্যোগ নেয়া উচিত। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনরত শিক্ষাথীের্দর দাবিও তাই। আমাদের প্রত্যাশাও তাই। সড়ক দুঘর্টনায় মৃত্যুর হার কমাতে হলে দোষীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণকেও সড়কপথে ভ্রমণ ও রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ ও শিক্ষিত চালকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পরিকল্পিত ও সফল উদ্যোগই কেবল পারে এমন মমর্মান্তিক মৃত্যু রোধ করতে।
যাইহোক সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভুমিকা সফল হয়েছে। সরকারও এজন্যে যে ভুমিকা রেখেছে তা সত্যি কার্যকর। তবে তৃতীয় পক্ষের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে।
তথ্যসূত্র- ইন্টারনেট।
লেখক: প্রাবন্ধিক।

এই সংবাদটি 649 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ