জীবাণুযুক্ত পানি জারে ভরলেই হয়ে যায় ‘পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার’

প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৬

জীবাণুযুক্ত পানি জারে ভরলেই হয়ে যায় ‘পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার’

ছবি - সময়চিত্র ফাইল ফটো

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টারের বিপরীত পাশের ফুটপাতে নাস্তা বিক্রি করছেন শহীদুল্লাহ। তার এখান থেকে একটি সিঙ্গারা খেয়ে পানি দিতে বললাম তাকে। জানতে চাইলাম, পানিটা ফিল্টারের (বিশুদ্ধ) কিনা। প্রশ্ন শেষ হবার আগেই তার সহজ উত্তর, জ্বি ভাই। পানির গ্লাসটা হাতে নিতেই দেখলাম, একটা লোক ভারে করে খোলা টিনে পানি এনে রাখছে একটি বড় ড্রামে। হাতে নেয়া পানি ভর্তি গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে দিয়ে নজর দিলাম সেই লোকটার দিকে। দেখলাম, ড্রাম থেকে সেই পানি ঢুকানো হচ্ছে ফিল্টারের নামে ব্যবহৃত সেই পানির জারে। তবে সেটি করা হচ্ছে অনেকটা হুটহাট করেই। কেউ যেন না দেখে সে চেষ্টাই ছিল। 

এভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলছে ফিল্টারের পানির নামে প্রতারণা। ওয়াসার লাইনের পানি দিয়েই ফিল্টার বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিক্রি করা হচ্ছে পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার হিসেবে। একইভাবে ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানি, তা দুর্গন্ধযুক্ত হোক কিংবা জীবাণুযুক্ত- জারে ভরে ‘পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার’ বলে বিক্রি করছেন রাজধানীর অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিন হাজার হাজার জার পানি বিভিন্ন অফিস, দোকান, রেস্টুরেন্ট ও আবাসিক হোটেলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পানি পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এই পানিতে বিষাক্ত জীবাণু ‘কলিফর্ম’ থাকার প্রমাণও মিলেছে। প্রকাশ্যে দুর্গন্ধযুক্ত ও মানহীন পানির রমরমা বাণিজ্য চললেও এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কোনো তৎপরতাই চোখে পড়েনা। কখনো কেউ এই পানি পান করে মারা গেলে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট সংস্থা গুলোর তৎপরতা দেখা মেলে। তবে দলীয় প্রভাব আর অবৈধ লেনদেনের সুবাধে সেটিও বেশী দিন স্থায়ী থাকে না।

বিএসটিআইয়ের তথ্যমতে, সারা দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পানি উৎপাদন কারখানার সংখ্যা ২৬০টি। এর মধ্যে রাজধানী এবং আশপাশের এলাকায় রয়েছে শতাধিক। তবে অবৈধ কোম্পানির সংখ্যা কত সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেনি বিএসটিআই। ঢাকা ওয়াসার তথ্যমতে, ৩৫টি পানি উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের ওয়াসার পানি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক জানান, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া পানির ব্যবসা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। বিএসটিআই এদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও চালায়। অবৈধ পানির ব্যবসা বন্ধ করতে বিএসটিআই সব সময় তৎপর রয়েছে। তবে আরেক কর্মকর্তা জানান, মানসম্মত পানির জন্য যে নিয়ম-কানুন মেনে চলা দরকার বেশির ভাগ কোম্পানি সেসব মেনে চলে না। বিএসটিআইয়ের লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোও মানহীন পানি বাজারজাত করে। তিনি আরও জানান, পানি কোম্পানির ল্যাব থাকতে হবে। সেখানে একজন রসায়নবিদ ও একাধিক পরিচ্ছন্ন কর্মী থাকবেন। যেসব কর্মী জারে পানি ভর্তি করবেন, তাদের সুস্বাস্থ্যের সনদ থাকতে হবে। লেবেল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে জারে। কারখানায় মাইক্রো বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা করা জরুরি। এ পরীক্ষা করা না হলে পানিতে ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডসহ নানা পানিবাহিত রোগের জীবাণু থেকে যেতে পারে। এ ধরনের কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ঢাকা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজে ওঠা পানি উৎপাদনকারীরা জারের পানি সরবরাহের ব্যবসা করছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিভিন্ন সময় অভিযানে অংশ নিয়ে দেখেছি, জার পরিষ্কার যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা হলেও বেশির ভাগ পানি উৎপাদন কারখানায় এসব নেই। জার পুনর্ব্যবহার করতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হয়, সেটিও করা হয় না। এছাড়া বৈধভাবে পানির ব্যবসা করতে হলে কমপক্ষে ২০-২৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। অবাক লাগলেও সত্য অনেকে ৪-৫ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দেন। পরে জরিমানা-জেল হলেও তারা আবার ওই ব্যবসা শুরু করেন। বিএসটিআইয়ের অসাধু অনেক কর্মকর্তাও তাদের সহযোগিতা করে থাকেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন অবৈধ মিনারেল ওয়াটার ব্যবসায়ীরা। বিএসটিআই’র লাইসেন্সবিহীন নামসর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠান মিনারেল ওয়াটারের নামে জারে মানহীন ও দূষিত পানি বাজারজাত করছে। এর ফলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি দূষিত পানি পান করে ভোক্তারা ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ পানি বাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘মিনারেল’ বা ‘বিশুদ্ধ’ এ ধরনের চটকদার নাম ব্যবহার করা হলেও তারা ওয়াসার লাইন থেকে সরাসরি জারে বা বোতলে পানি ভরে ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ করছে। কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে কলের পানি বোতলজাত করে বাজারজাত করছে। কোনো ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ না করে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার লাইসেন্স না নিয়ে তারা ব্যবসা করে যাচ্ছে। বিএসটিআই’র নির্ধারিত শর্ত মেনে ড্রিংকিং ওয়াটার বাজারজাত করার বিধান থাকলেও মাঠ পর্যায়ে এ শর্ত মানা হচ্ছে কিনা তা নজরদারির কেউ নেই।

সূত্র মতে, ওয়াসার পানির প্রতি অনাস্থা এবং বোতলজাত পানির দাম বেশি হওয়ায় স্বল্প খরচে চাহিদা পূরণ করতে মানুষ এ পানি পান করছে। যদিও আধা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের কনটেইনার বা জারে ভর্তি এ ‘পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার’ ওয়াসারই পানি। আর কম ব্যয়ে প্রয়োজন সেরে অসুখে ভুগে উচ্চ ব্যয়ই করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় নগরবাসীর অনেকেই বাসাবাড়িতে জারের পানি কিনে খাচ্ছেন। এছাড়া রাস্তার ফুটপাতে গড়ে ওঠা চায়ের দোকানগুলোতেও এক গ্লাস এক টাকা মূল্যে এ পানি বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, স্কুল-কলেজ, বেকারি, ফাস্টফুডের দোকান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চাহিদামতো জারের পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। নামে-বেনামে মানহীন পানি জারে ভরে বিক্রি করছে ব্যবসায়ী নামধারী প্রতারক চক্র। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ পানি আদৌ শোধন করা হয় না। পানি প্রতারকরা ওয়াসার দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ফিটকিরি ও দুর্গন্ধ দূর করার ট্যাবলেট মিশিয়ে জারে ভরছে। পরে বাজারজাত করছে। মাত্র কয়েকটি কোম্পানি মোটরের সাহায্যে পানি তুলে সরাসরি জারে ভরে বাজারজাত করছে।

পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক জানান, ঢাকা ওয়াসা রাজধানীবাসীর বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় জারের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। ওয়াসার সরবরাহ করা পানি ব্যবহার অযোগ্য হওয়ায় মানুষ জার বা বোতালজাত পানির দিকে ঝুঁকছে। ঢাকা ওয়াসার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই পারে মানহীন জার বা বোতলের পানি-বাণিজ্য বন্ধ করতে। তিনি বলেন, ওয়াসার পানির বিশুদ্ধতা বিষয়ে নগরবাসীর মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। কেননা পানির রূপ-গন্ধ থেকেই বোঝা যায় কতটুকু বিশুদ্ধ। ঢাকা ওয়াসাকে এই ভীতি দূর করতে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে পুরনো পদ্ধতি বা জনসমাগমস্থলে বিনামূল্যে পানি খাওয়ার সুবিধা চালু করতে হবে। কাজটি কোনো এনজিওকে দিয়েও করানো যেতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. সাইদুর রহমান জানান, পানিবাহিত রোগের সংখ্যা অনেক। টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়াসহ বহুবিধ রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। তিনি আরও জানান, মানহীন পানি বিক্রি বন্ধ করতে নিরাপদ খাদ্য কমিটির বৈঠকও হয়। বৈঠক থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। ব্যবসায়ীদের আলটিমেটাম দেয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত আসে। কিন্তু উদ্যোগ গুলোর বাস্তবায়ন তেমন হচ্ছে না। যেহেতু পানির অপর নাম জীবন, তাই নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিৎ করা সকলের দায়িত্ব।

সূত্র মতে, দুই দশক আগেও রাজধানীর বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করত ঢাকা ওয়াসা। গভীর নলকূপ থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে জনসমাগমস্থলে ট্যাপ বসিয়ে এ সেবা দেয়া হতো। কিন্তু অপব্যবহার ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগে ওয়াসা এসব ট্যাপ উঠিয়ে দিয়েছে। এ কারণে পথচারী, দিনমজুর, রিকশা-অটোরিকশা, বাস-মিনিবাসের চালক যাত্রীসহ বিপুল সংখ্যক নগরবাসীর পানির তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে জারের পানি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬২ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকে বিষাক্ত বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পানি শোধন করে সরবরাহ করছে ঢাকা ওয়াসা। এ দুটি নদীর পানিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা এতই বেশি যে শোধন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিষাক্ত পানিকে ব্যবহারযোগ্য করতে শোধনের সময় অতি মাত্রায় মেশানো হচ্ছে ক্লোরিন, এলাম (চুন) ও লাইন (ফিটকিরি)। তারপরও পানি দুর্গন্ধমুক্ত হচ্ছে না। অনেক সময় শোধন করা পানি থেকে বেরিয়ে আসছে ক্লোরিনের গন্ধ। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আছে পাইপ লাইনের অসংখ্য ফুটো (লিকেজ)। সেসব ফুটো দিয়ে পাইপ লাইনে যুক্ত হচ্ছে বর্জ্য। অনেক সময় স্যুয়ারেজ লাইনও যুক্ত হচ্ছে। সে কারণেই ট্যাপ দিয়ে বেসিনে পড়া পানি থেকেও মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসছে উৎকট গন্ধ। ওই পানি অতিমাত্রায় ফুটিয়েও পানযোগ্য করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর। সব কিছু জেনেও পানি প্রতারকরা এসব পানি দুর্গন্ধ দূর করার কিছু ওষুধ দিয়েই জারে ভরে বাজারজাত করছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির জানান, রাজধানীতে বৈধ পানি তৈরির কারখানা ৪০টির বেশী হবে না। এখন কারখানার সংখ্যা কয়েকশত। তিনি জানান, আমরা যারা লাইসেন্স নিয়ে পানির ব্যবসা করছি, নানা অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে আমরা মামলা খাচ্ছি, জরিমানা দিচ্ছি। সামান্য নোংরা পরিবেশের জন্যও মামলা খেতে হয়, জরিমানা দিতে হয়। কিন্তু অবৈধ পানি ব্যবসায়ীদের কিছুই হচ্ছে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা ব্যবসা করছেন।

জানা গছে, অলিগলিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাই রমরমা। এগুলোর মালিক বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এদের দাপটে বৈধ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা লাটে উঠেছে। এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধে বিএসটিআই, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তৎপর থাকার কথা থাকলেও সে বিষয়ে তারা নির্বিকার। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও সে ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অনুপস্থিত।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান জানান, ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানি বিশুদ্ধ। তবে শুষ্ক মওসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় পানিতে কিছুটা দুর্গন্ধ হয়। তিনি আরও জানান, জারের পানির বিষয়ে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনা। এটি অন্য সংস্থা মনিটর করে থাকে। তবে রাজধানীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। তবেই বিদ্যমান সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব।

এই সংবাদটি 989 বার পঠিত হয়েছে