জীবিকার একমাত্র মাধ্যম যখন সুই-সুতা

প্রকাশিত: ১০:২৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০১৭

জীবিকার একমাত্র মাধ্যম যখন সুই-সুতা

এম.এ সাইদ (তন্ময়) :

অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনাপাড়ের অধিকাংশ বাসিন্দা। আগ্রাসী ভাঙন অনেকের জীবনের রঙ-রূপ বদলে দিয়েছে। একসময়ের জমির মালিক আজ দিনমজুর। নিঃস্ব বাসিন্দারা পেটের তাগিদে কেউ কেউ কুলি-মজুর খাটতে শহরে গেছেন। আবার জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করতে না পেরে ভাঙনকবলিত জনপদেই আশ্রিত হয়েছেন অনেকে।
এদের কেউ বাঁধের বাইরে ছোট্ট ঘরে বসবাস করছেন, আবার কারো ঠাঁই হয়েছে বাঁধের ওপর। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে চালিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম লড়াই। এ লড়াইয়ে পুরুষের পাশাপাশি রয়েছে নারীদেরও সমান অংশগ্রহণ। সুই-সুতা দিয়ে নকশি কাঁথা তৈরি করে দৈনন্দিন আয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন নারীরা।
ভাঙনকবলিত পরিবারের নারীরা এখন নকশি কাঁথা তৈরির মাধ্যমে সংসার পরিচালনা করছেন। গ্রামীণ নারীরা পুরুষের সহযোগিতায় নকশি কাঁথা সেলাই করে যমুনা নদীর বিভিন্ন শহরে শোরুমে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
সারিয়াকান্দি উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত গ্রাম বড় কুতুবপুর। এ গ্রামের বাসিন্দারা যমুনা নদীর ভাঙনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এসব ভাঙনকবলিত পরিবারের নারীরা এখন সংসারের কাজ শেষে নকশি কাঁথা সেলাই করে সংসার পরিচালনা করছেন। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন পুরুষরা। নকশি কাঁথা সেলাইয়ের জন্য বগুড়া শহর থেকে ভালো মানের সুতা, সুই ও পাইকারি ব্যবসায়ী ঠিক করে দেন পুরুষরা। আর নারীরা দল বেঁধে বসে সুই-সুতা দিয়ে তৈরি করেন নকশি কাঁথা।
নকশি কাঁথা তৈরির মূল উপাদান হলো— পুরনো কাপড় ও নানা রঙের সুতা। পুরনো কাপড় কয়েক ভাঁজ করে সুই-সুতার কারুকাজ দিয়ে তৈরি করা হয় নজরকাড়া ডিজাইনের নকশি কাঁথা। এসব ডিজাইনের আবার বিভিন্ন নাম রয়েছে, যেমন— রান ফোঁড়, ডবল রান, তেরছা ফোঁড়, কাইত্যা ফোঁড়, এক ফুঁইড়া, বখেরা ফোঁড়, গাট ফোঁড়, লিক ফোঁড়, ক্রসস্টিচ, তারা ফোঁড়, বাঁশপাতা ফোঁড়, বৈকা ফোঁড় ইত্যাদি।
নিপুণ হাতে তৈরি এসব নকশি কাঁথায় কেউ আবার সেলাইয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন গ্রামবাংলার নানা ঐতিহ্য। ফুটিয়ে তোলা গ্রামীণ পটভূমির ভিন্নতায় নামকরণও করা হয় নকশি কাঁথার, যেমন— পাখিলতা, আটপাতা ফুল, খেজুর ছড়ি, চোখ, মাছ, পিঁপড়ার সারি, চাঁদ, নৌকাবিলাস, নদী, ঢেউ, বেহুলা কাঁথা ইত্যাদি।
বগুড়ার সারিয়াকান্দির কুতুবপুর ইউনিয়নের বড়কুতুবপুর গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জিলা বেগম। গ্রামের অন্য বাসিন্দাদের মতো তিনিও যমুনার ভাঙনে সব হারিয়ে আজ নিঃস্ব। মঞ্জিলা বেগম জানান, ঢাকায় থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজন কাঁথা সেলাইয়ের জন্য অর্ডার দেন। কাঁথার আকারভেদে দামের ভিন্নতা হয়। ছোট কাঁথা ৬০০-৮০০ টাকা, মাঝারি আকারের কাঁথা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা মজুরির বিনিময়ে তৈরি করে দেন তারা। তবে কাঁথার ডিজাইন ও আকারের ভিন্নতার কারণেও দাম কমবেশি হয়। মাঝারি আকৃতির একটা কাঁথা সেলাই করতে সময় লাগে ১০-১৫ দিন।
এছাড়া স্পেশাল নকশি কাঁথা একটানা সেলাই করতে সময় লাগে ১০-১২ দিন। আর একই কাঁথা সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে সেলাই করতে সময় লাগে এক-দেড় মাস। তিনি জানান, কাঁথা সেলাই করে বেশ ভালোই আয় হয়। এ আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ও করা যায়। তাই সংসারের কাজের ফাঁকে কাঁথা সেলাইয়ে যুক্ত হচ্ছেন আরো অনেক।
সাহেরা বেওয়া নামে আরেক গৃহিণী জানান, ঢাকার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সেলাই করা কাঁথা নিয়ে যায়। প্রতি মাসে কাঁথা সেলাই করে গড়ে ৪-৬ হাজার টাকা আয় করা যায়। তবে কাজের অর্ডারের ওপর আয় নির্ভর করে। যার যত বেশি অর্ডার থাকবে, তার আয় তত বেশি হবে।
তিনি জানান, বাড়ির পুরুষরা শহর থেকে সুই-সুতা সংগ্রহ করে দেন। কাঁথা তৈরি করে সংসার পরিচালনা করা দেখে আশপাশের গ্রামের নারীরাও এ পেশায় ঝুঁকছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোহেল জানান, বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় কিছু বিপণিবিতান রয়েছে, যারা নকশি কাঁথা কেনাবেচা করে। কাঁথা সেলাই করে তাদের শোরুমে দিলেই কাঁথার আকার অনুযায়ী দাম দিয়ে দেয়। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান চাহিদামতো অর্ডার দিয়ে থাকে। শোরুমগুলোয় এ কাঁথা বিক্রি হয় ৫-৬ হাজার টাকায়।
বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলার শখ বিপণিবিতানের বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাঁথা সেলাইয়ের জন্য কয়েকটি এলাকায় অর্ডার দিয়ে থাকেন তারা। নিজেরা অর্ডার দিয়ে নকশা করিয়ে নেন। সে নকশা অনুযায়ী কাঁথা তৈরি করে শোরুমে বিক্রি করেন তারা।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘প্রতি বছরই যমুনা নদীর ভাঙনে অভাবী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা বিভিন্ন পেশায় ঝুঁকছে। বাজারে গ্রামীণ নারীদের তৈরি নকশি কাঁথার চাহিদা ব্যাপক। এ পেশায় যুক্ত নারীরা যদি সুসংগঠিতভাবে এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে সরকারের দেয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তাদের সরবরাহ করা যাবে।’

এই সংবাদটি 657 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ