ঢাকা |
প্রকাশিত: ১:০১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১
চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত সেনাবাহিনীর (অব.) মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকার্যের তৃতীয় দফায় তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামি পক্ষের জেরা সম্পন্ন হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ চলে।
সোমবার সাক্ষ্য দিয়েছেন টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর গ্রামের মৃত ফজল করিমের ছেলে আবদুল হামিদ, মৃত লাল মিয়ার ছেলে মো. ফিরোজ ও মৃত সৈয়দ করিমের শওকত আলী।
এসময় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আবদুল হামিদ আদালতকে বলেন, পরপর কয়েকটি গুলির আওয়াজ শুনে আমি ঘটনাস্থলে যাই। গিয়ে দেখি পরিদর্শক লিয়াকত মোবাইল বের করে কাউকে ফোন করেন। এই সময় তিনি দুজনকে হ্যান্ডকাপ লাগান। নন্দ দুলাল গুলি খাওয়া লোকটিকে হ্যান্ডকাপ লাগান। লম্বা চুলওয়ালা লোকটির পাশে গিয়ে শাহজাহান আলীকে লোকটিকে হ্যান্ডকাপ লাগাতে বলেন। শাহজাহান আলী বলেন হ্যান্ডকাপ নাই। তখনি এপিবিএন সদস্য দৌড়ে বাজারে গিয়ে রশি নিয়ে আসেন। নন্দ দুলাল, রাজিব ও আবদুল্লাহ মিলে লম্বা চুলওয়ালা লোকটিকে শক্ত করে বাধেন।
এরপর পরিদর্শক লিয়াকত ফোন করে বলেন, টার্গেট ফেলে দিয়েছি। আবার ফোন করে বলেন, স্যার একজনকে ডাউন করেছি, আরেক জনকে ধরে ফেলেছি স্যার। লিয়াকত গুলি খাওয়া লোকটির কাছে গিয়ে রাগ করে কি যেন বলে লাথি মারেন। লোকটি পানি চায়। তখন লিয়াকত স্যার বলে তোকে গুলি করেছি কি পানি খাওয়ানোর জন্য।
কিছুক্ষণ পর পুলিশ ফাঁড়ির দিক থেকে আরও চারজন অস্ত্রসহ পুলিশ- লিটন, সাফানূর, কামাল ও ক্যাশিয়ার মামুন ঘটনাস্থলে আসেন। ওই চারজন অস্ত্র উঁচু করে লোকজনকে নির্দেশ দেন কেউ সামনে আসবেন না। গুলি খাওয়া লোকটিকে কোনো সাহায্য করবেন না। মামুন ও সাফানূরকে প্রাইভেটকার তল্লাশি করতে বলেন পরিদর্শক লিয়াকত। প্রাইভেটকার তল্লাশি করে একজন পুলিশ চিৎকার করে বলেন- পেয়েছি, গাড়ির ভেতরে পিস্তল ও কিছু কাগজপত্র পেয়েছি।
এ সময় দক্ষিণ দিক থেকে একটি নোহা আরেকটি পুলিশের পিকআপ গাড়ি নিয়ে ওসি প্রদীপ আসেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে ঘটনাস্থলে গিয়ে লিয়াকত, নন্দুলালের সঙ্গে কানেকানে কিছু কথা বলেন। ওসি প্রদীপ সেনাবাহিনীর মতো পোশাক পরা লোকটির কাছে গিয়ে রাগ করে বলেন, ‘অনেক চেষ্টার পর কুত্তার বাচ্চাকে শেষ করতে পেরেছি’।
সাক্ষীরা আদালতেকে জানান, মানুষটি (সিনহা) তখন জীবিত ছিলেন। ওসি প্রদীপ গুলি খাওয়া লোকটির বাম পাশে কয়েকটি লাথি মারেন এবং পা দিয়ে গলার ওপর চেপে ধরেন। ওসি প্রদীপের পায়ে বুট জুতা ছিল। কিছুক্ষণ পর মানুষটির নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ওসি প্রদীপের সঙ্গে আসা পুলিশদের প্রাইভেটকার তল্লাশি করতে বলেন। সাগর ও রুবেল যাদের নাম ওসি প্রদীপের ডাকাডাকিতে জানতে পারি, তারা প্রাইভেট কারে এসে বলেন ইয়াবা ও গাঁজা পেয়েছি স্যার।
ওসি প্রদীপ ও লিয়াকত গাড়ির আড়ালে গিয়ে কিছু কথা বলেন। ওসি প্রদীপ প্রাইভেটকারের কাছে আসেন এবং লম্বা চুলওয়ালা লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোরা কিসের ভিডিও করেছিস? ক্রসফায়ারের ভিডিও করেছো, এগুলো কোথায়? তোদেরকে কক্সবাজার ছেড়ে চলে যেতে বলছিলাম। যাও নাই বলে তোদের আজকে এই পরিণতি হয়েছে। সাগর ও রুবেল অন্যান্য পুলিশ লম্বা চুলওয়ালা লোকটিকে এপিবিএন চেকপোস্টের ভেতরে ঢুকাইয়া চোখে গামছা বেঁধে পানি ঢালেন।
আদালতে সিনহা হত্যার এমনই বিবরণ দিয়েছেন তিন সাক্ষী। বিচারকাজের সঙ্গে জড়িত একাধিক আইনজীবী এমন তথ্য জানিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারী কৌঁসুলি ফরিদুল আলম বলেন, তৃতীয় দফার সাক্ষ্যগ্রহণ চলবে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রথমদিনে তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে কারাগার থেকে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ-লিয়াকতসহ ১৫ জন আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
এর আগে গত ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট টানা তিন দিন মামলার প্রথম দফায় ১নং সাক্ষী ও বাদী শারমিন সাহরিয়া ফেরদৌস এবং ২নং সাক্ষী সাহেদুল ইসলাম সিফাতের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। একইভাবে গত ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর টানা চার দিনে দ্বিতীয় দফায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেন আদালত। এ নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় ৭৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। সোমবার সাত সাক্ষী নিয়ে তৃতীয় দফায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
গত বছরের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় সে সময় সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয় লিয়াকত আলীকে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় একটি এবং রামু থানায় আরেকটি মামলা করে। এরপর মেজর সিনহা নিহতের ছয় দিন পর লিয়াকত আলী ও ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
পরে ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার অভিযোগে টেকনাফ থানায় পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষী এবং শামলাপুর চেকপোস্টে ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনকারী আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর টেকনাফ থানার সাবেক কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে গ্রেফতার করে র্যাব। গত ২৪ জুন মামলার অন্য পলাতক আসামি টেকনাফ থানার সাবেক এএসআই সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
আসামিদের মধ্যে ওসি প্রদীপ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্য ১২ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত শেষে গত বছর ১৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন র্যাব ১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ২৭ জুন ১৫ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এতে ৮৩ জনকে সাক্ষী করা হয়।
রেজিঃ নং চ-৭৩৫
সম্পাদক ও প্রকাশক: এম.ফয়জুল হক শিমুল
সহ: সম্পাদক : হাবিবুর রহমান সুলতান
সহ: সম্পাদক : নুরুল হক মাসুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক নিউ বর্ণমালা অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, রাজা ম্যানশন জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: * সি-৮/৩০ বনশ্রী ঢাকা।
সিলেট অফিস: কমন মার্কেট (৫ম তলা ) বন্দর বাজার, সিলেট।
বিয়ানীবাজার অফিস: ছফর কমপ্লেক্স, দক্ষিণ বিয়ানীবাজার, সিলেট।
যোগাযোগ মোবাইলঃ +88-01713813124
ই-মেইল ॥ somoychitro@gmail.com
বড়লেখা অফিস: নেহার মার্কেট, ( ২য় তলা), বড়লেখা, মৌলভীবাজার।