আমদানি না হলেও মজুদ পিয়াজ দিয়ে আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব–বানিজ্য মন্ত্রণালয়

প্রকাশিত: ৩:৩৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

আমদানি না হলেও  মজুদ পিয়াজ দিয়ে আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব–বানিজ্য মন্ত্রণালয়

সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও এখন পর্যন্ত আসেনি তেমন কোনো ইতিবাচক ফল।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পেঁয়াজ আমদানিকারকদের একটি গ্রুপ সব সময় ওতপেতে থাকে কখন ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়। সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকটের। এর সুযোগ নিয়ে তারা হুহু করে দাম বাড়িয়ে থাকে। গত বছর পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা কেজি থেকে বেড়ে ৩২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। যারা অসাধু ব্যবসায়ী, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সৎসাহস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই। আবার কর্তৃপক্ষ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সুবিধাভোগী। যে কারণে এটি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। আর সাধারণ মানুষ এই দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি।

তিনি আরও বলেন, মূল বিষয় হল- সুশাসনের ঘাটতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। এখানে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। সুশাসন নিশ্চিত না হলে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজুমার ইয়ুথ বাংলাদেশ (সিওয়াইবি)। জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ
গণ মাধ্যমকে বলেন, পেঁয়াজ নিয়ে পুরনো সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়েছে। পেঁয়াজ নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত বছর একটি চক্র মানুষকে জিম্মি করে অর্থ লুট করেছিল। এদের চিহ্নিত করার পরও ওই সময় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়নি। যে কারণে এবারও তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে পেঁয়াজের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। দেশে এখন থেকে নতুন পেঁয়াজ আমদানি না হলেও যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

ভারত রফতানি বন্ধ করার পর পেট্রাপোল সীমান্তে প্রায় ১৫০টি পেঁয়াজবোঝাই ট্রাক আটকে রয়েছে। সেখানে ৪৫০ টন পেঁয়াজ রয়েছে। এগুলো ছাড় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আরও ১৯ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

এর বাইরে সংকট মোকাবেলায় ভারতের বিকল্প আরও ৬ দেশ থেকে আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে : চীন, মিয়ানমার, মিসর, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস ও পাকিস্তান।

বেসরকারিভাবে আমদানিকারকরা ওই সব দেশ থেকে আমদানির জন্য ১০১টি অনুমতিপত্র সংগ্রহ করেছে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র থেকে। ফলে প্রথম পর্যায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে আনা সম্ভব হবে, যা আগামী ৭ দিনের মধ্যে দেশের বাজারে আসবে।

এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে আরও আমদানি বাড়বে। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে তুরস্ক থেকে এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বর্তমানে দেশে ৫-৬ লাখ টন পেঁয়াজ রয়েছে। নতুন পেঁয়াজ ওঠা পর্যন্ত আমাদের আরও প্রায় চার লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। ইতোমধ্যে টিসিবি টার্কি (তুরস্ক) থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলে ফেলেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিসিবির মাধ্যমে এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করব। দেশে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। ঘাটতি যে পরিমাণে আছে, তা এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করা হবে।

একাধিক আমদানিকারক জানান, গত বছরের মতো এবারও পেঁয়াজ নিয়ে ভারত ঝামেলা করতে পারে। যার কারণে বেসরকারিভাবে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে বিকল্প ৬টি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ফলে ভারত রফতানি বন্ধের ১১ দিন আগে থেকেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আওতাধীন উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের কাছ থেকে বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা ১০১টি আমদানি অনুমতি পত্র সংগ্রহ করে। ওইসব দেশ থেকে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ আনার অনুমতি দেয়া হয়। আগামী ৭ দিনের মধ্যেই এসব পেঁয়াজ দেশে আসবে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বুলবুল বলেন, ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার জন্য দেশের আমদানিকারকদের আবেদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পত্র গ্রহণ করছি। ইতোমধ্যে আমরা ১০১টি পত্র ইস্যু করেছি। প্রথম পর্যায়ে অনুমতি পেয়ে ৩০টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ দেশের বাজারে আসবে। পর্যায়ক্রমে আরও বিপুল পরিমাণে পেঁয়াজ বাংলাদেশে ঢুকবে।

এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেঁয়াজের নতুন মৌসুম আসতে এখনও ৬ মাস বাকি। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে নতুন দেশি পেঁয়াজের জন্য। এ সময়ে মধ্যে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ১১ লাখ টন। বর্তমানে মজুদ আছে ৫ লাখ টন। পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে ৬ লাখ টন। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশে এই ৬ লাখ টন পেয়াজ আমদানি করতে হবে। এ ব্যাপারে বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এদিকে ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী যেসব পণ্যের আমদানির দেনা পরিশোধ করা হয় সেগুলো ছাড় করার নিয়ম রয়েছে। এ হিসাবে ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পেঁয়াজ ছাড় করার জন্য সরকারিভাবে তৎপরতা চলছে।

এই সংবাদটি 597 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ