১৭ লাখ টাকা দাম হাকা গরু ১৩ লাখ টাকায় বিক্রি করছেন না মজনু

প্রকাশিত: ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৬

১৭ লাখ টাকা দাম হাকা গরু ১৩ লাখ টাকায় বিক্রি করছেন না মজনু

রাসেল চৌধুরী, (ঢাকা): মেরুল বাড্ডা-আফতাবনগর হাটে উঠা কালচে লাল রংয়ের সেই গরুটির দাম উঠেছে ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বিক্রেতা ১৭ লাখের কমে

বিক্রি করতে নারাজ। গত দুই দিন ধরে আফতাবনগর হাটের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই গরুটি। গরুটি দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতা দর্শনার্থীরা। কেউ দাম দর করছেন। আবার কেউ সেলফি তুলছেন।

গরুর বেপারি মজনু প্রামাণিক বলেন, দুই বছর ধরে তিনি এই গরুটি লালন পালন করেছেন। গরুটির পেছনে তার কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। পরিশ্রমও গেছে অনেক। ১৭ লাখ টাকার কমে গরুটি বিক্রি করলে তার লাভ হবে না।

গরুটির দাম কেউ ৯ লাখ, কেউ ১০ লাখ বা ১১, সাড়ে ১১ লাখ টাকা পর্যন্ত বলছেন। তবে উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হাজী আবু তাহের গরুটি কিনতে সর্বোচ্চ দাম ১৩ লাখ টাকা বলেছেন।

এদিকে গত কয়েক দিন হাটে গিয়ে ক্রেতারা কেবল দাম-দর করলেও গরু খুব একটা কেনেননি। শনিবার সকাল থেকেই তারা গরু কিনতে শুরু করেছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটগুলোতে বাড়ছে ক্রেতাদের চাপ। হাটের কাছাকাছি এলাকার বাসিন্দারা গরু কিনে হেঁটে রওনা দিলেও দূরের ক্রেতাদেরকে ট্রাকে করে কোরবানীর পশু নিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।

তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, গতবারের চেয়ে এবার সব ধরনের গরুর দাম তুলনামূলক বেশি। মাঝারি মানের একটি গরুতে গতবারের চেয়ে ১০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

রাজধানীর ব্রাদার্স ইউনিয়ন সংলগ্ন বালুর মাঠ ও কমলাপুর স্টেডিয়াস সংলগ্ন খালি জায়গা, খিলগাঁও মেরাদিয়া পশুরহাট, ঝিগাতলা হাজারীবাগ মাঠ, রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, উত্তর শাহজাহানপুর, খিলগাঁও মৈত্রী সংঘের মাঠ, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা, খিলক্ষেত আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা, মিরপুর সেকশন-১১-এর বাউনিয়া বাঁধসংলগ্ন খালি জায়গা, বারিধারা ‘জে’ ব্লক এবং গাবতলি পশুর হাটসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাট ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

কোনো কোনো ক্রেতা মনে করছেন, শেষের দিকে আরও গরু আসবে। তখন দাম কমতে পারে। তাছাড়া গরু রাখার জায়গার অভাব এবং লালন পালনে আসুবিধার কথা ভেবে তারা এখনই গরু কিনছেন না। কেউ কেউ আবার দাম বা অন্য অসুবিধার দিকে তাকাচ্ছেন না। পছন্দ হলেই গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, আগে থেকে গরু কেনার মজাই আলাদা। কোরবানীর আগে নিজের হাতে গরুকে লালন-পালন করলে মনে অন্যরকম শান্তি অনুভূত হয়। তাছাড়া গরুকে দেখে ও লালন-পালন করে বাসার বাচ্চারা খুশি হয়। এছাড়া শেষদিকে গরুর সংকট দেখা দিতে পারে। তাই তারা তুলনামূলক আগেই গরু কিনছেন।

এক লাখ ৩১ হাজার টাকায় বারিধারা ‘জে’ ব্লক পশুর হাট থেকে একটি লাল ষাড় কিনেছেন কুড়িলের শফিক আহমেদ। গরু কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এ প্রতিবেদককে জানালেন, এবার গরুর দাম তুলনামূলক চড়া। গতবার এ ধরনের গরু কিনেছিলাম ৯০ হাজার টাকা দিয়ে। এবার কিনলাম ৪১ হাজার টাকা বেশি দিয়ে।

জানতে চাইলে এই গরুর বিক্রেতা সেতু মিয়া জানান, দেশের বাইরে থেকে গরু আসবে না জেনে এবার গরু কিনতে হয়েছে বেশি দামে। গরুর খাবারের দামও বেড়েছে। যে ভূসি আগে কেনা হতো ২২ টাকা করে এখন তা কিনতে হচ্ছে ৩২ টাকায়। তাছাড়া গরুর পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পথে পথে চাঁদা দিতে হচ্ছে। তাই গরুর দাম বেড়ে যাচ্ছে।

মেরুল বাড্ডা-আফতাবনগর গরুর হাট থেকে ৯০ হাজার টাকায় বেপারি মুন্তাজ আলীর কাছ থেকে গরু কিনেছেন খিলগাঁওয়ের সোহেল মিয়া। তিনি জানালেন, গতবারের চেয়ে এবার গরুর দাম বেশি। গতবার এই গরুটি ৭০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা যেতো।

শান্তিনগরের ক্রেতা আলাউদ্দিন জানালেন, তিনদিন ধরে তিনি গরু কিনতে বিভিন্ন হাটে গিয়েছেন। আজ একটি গরু পছন্দ হলো। ৮৫ হাজার টাকায় তিনি তা কিনে নিলেন। তিনি জানান, হাটে প্রচুর গরু থাকলেও বিক্রেতারা দাম কমাচ্ছেন না।

এই গরুর বিক্রেতা শহিদুল হক জানান, তিনি ২১টি গরু নিয়ে তিনদিন আগে আফতাবনগর হাটে এসেছেন। আগের দুইদিনে একটি গরুও বিক্রি হয়নি। তবে আজ (শনিবার) ৬টি গরু বিক্রি হয়েছে। তিনি জানান, লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করতে চাই না। তাই শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। সামান্য লাভ হলেও গরু ছেড়ে দেবো। না হলে ট্রাকে করে গরু ফেরত নিয়ে যাবো।

বনশ্রীর ফোরকান আলী এক লাখ টাকায় একটি গরু কিনেছেন। মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, অন্য বছর এই গরুটির দাম ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ছিল। এখন গরু বেশি থাকলেও শেষের দিকে ভাল গরু না-ও পাওয়া যেতে পারে। তাই আগেই কিনে নিলাম।

গরু কেনার পর খিলগাঁওয়ের মজিবুল হক জানান, তিনি এক লাখ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে যে গরু কিনেছেন গত বছর সেটি ৯০ হাজার টাকা দিয়েই কিনতে পারতেন। গুলশান নিকেতেনের মাজেদুর রহমান জানান, সার্বিকভাবে এবার গরুর দাম বেশি। তিনি ৭০ হাজার টাকায় যে গরু কিনেছেন সেটি গত বছর ৫০-৫৫ হাজার টাকায় কিনতে পারতেন।

মেরুল বাড্ডা-আফতাবনগর গরুর হাটের ইজারাদার মোহাম্মদ রায়হান বলেন, তার হাটে প্রচুর গরু আছে। এতদিন ক্রেতা না থাকলেও শনিবার থেকে ক্রেতার চাপ বেড়েছে। বিক্রিও ভাল হচ্ছে। তিনি জানান, এক বেপারী একটি খাসির দাম হাঁকিয়েছেন এক লাখ ১০ হাজার টাকা চাচ্ছে। ওই খাসির সঙ্গে একটি গরু ফ্রি দেয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, আশিয়ান সিটির লোকজন তার হাটের গরুর ট্রাকগুলো জোর করে তাদের (আশিয়ান সিটি) হাটে নিয়ে যাচ্ছে।

মেরাদিয়া গরুর হাটে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড থেকে তিনদিন আগে ৪৫টি মধ্যম সাইজের গরু নিয়ে এসেছেন বেপারি কিনথ, আকরাম, আকিকুল, শেরেকুল ও সানোয়ার। তারা জানালেন, শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ১১টি গরু বিক্রি করেছেন। একটি গরু বিক্রি করেছেন ৪৩ হাজার টাকায়। বাকি গরুগুলো ৬০ থেকে ৭২ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি করেছেন।

তারা জানান, প্রতি গরু কিনতে গতবারের চেয়ে এবার ১০-১২ হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। খাবারের দামও বেশি। তাই তাদেরকেও বেশি দামে গরু বিক্রি করতে হয়েছে। তারা আরও বলেন, একটি গরু ১০ হাজার টাকা লাভ হলেও সেটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। ঈদের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে। শেষের দিকে কেনা দামে হলেও গরু বিক্রি করবো। তবে লোকসান দিয়ে নয়।

শৈলকূপা থেকে দুটি গরু নিয়ে খামারী আবদুল ওয়াদুদ মেরাদিয়া হাটে এসেছেন। গরু দুইটির দাম তিনি এক লাখ ২০ হাজার টাকা করে হাঁকাচ্ছেন। তিনি বলেন, এলাকায় বেপারিরা গরুগুলোর দাম ৮০ হাজার টাকা বলেছিলেন। বেশি দামের আশায় গরুগুলো ঢাকায় এনেছি। এ পর্যন্ত গরু দুইটির দাম উঠছে ৬০ হাজার টাকা। এক লাখের কমে গরু দুইটি তিনি বিক্রি করবেন না বলে জানান।

এই সংবাদটি 712 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ