মান যাচাই ছাড়াই জ্বালানি তেল বিক্রি করছে ৫ হাজার পেট্রোল পাম্প

প্রকাশিত: ২:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০১৬

মান যাচাই ছাড়াই জ্বালানি তেল বিক্রি করছে ৫ হাজার পেট্রোল পাম্প
  • এক বছরে ১৫৩ ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৩৯৯ মামলা
  • যানবাহনে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারে ঝুঁকি বাড়ছে 

কামাল উদ্দিন সুমন : ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যাতায়াতকারী যাত্রীবাহি টেম্পুর ভেতরই রুমালে মুখ ঢেকে আছে যাত্রী মেহদী হাসান রনি। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। তার মতো অন্য যাত্রীদের একই অবস্থা। জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, বসেন টের পাবেন। সবার চোখ জ্বালা করছে, মনে

 

হচ্ছে কেউ চোখে মুখে মরিচ ছুঁড়ে দিয়েছে। পরক্ষণেই বুঝতে বাকি রইল না, ভেজাল অকটেনের কারণে এ অবস্থা। অতিরিক্ত সালফারযুক্ত হওয়ায় টেম্পু থেকে নির্গত ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছে। ড্রাইভার সুজন জানালো মাত্র পেট্রোলপাম্প থেকে অকটেন নিয়েছে সে। প্রায় সময়ই এরকম অবস্থার কারণে যাত্রীদের বকাঝকা শুনতে হয় তার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এভাবে মান যাচাই ছাড়াই সারা দেশের প্রায় ৫ হাজার পেট্রোলপাম্পে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল। নিয়ম অনুযায়ী অকটেন, ডিজেল ও পেট্রলের বিএসটিআই মান সনদ নেয়া বাধ্যতামুলক থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এর নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিগুলো নেয়নি। ফলে পেট্রোলপাম্পগুলোতে সরবরাহ করা মান যাচাই ছাড়া জ্বালানি তেল নিয়ে একদিকে গ্রাহক যেমন ঠকছে অন্যদিকে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের সাথে ভেজাল মিশিয়ে সরবরাহ করার অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ দিনের।

বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, জ্বালানি তেলে সিএম লাইসেন্স গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে একটি সভা হয়েছে। ওই সভায় মূলত লাইসেন্স কারা নেবে (বিপিসি, বেসরকারি পরিশোধনকারী, নাকি ফিলিং স্টেশনগুলো), তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা এগিয়ে চলছে। পেট্রোলের মান ৮৭ নম্বর থাকলেও এটি ৮০-এর বেশি করা সম্ভব নয়। এটি নিয়েও ঝামেলা রয়েছে।

অথচ গত বছরের ১১ নবেম্বর বিএসটিআইয়ের পক্ষ থেকে বিপিসির পরিচালকের (বিপণন) কাছে চিঠি দেয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, মান যাচাই ছাড়া জ্বালানি তেল বিপণন ও সিএম লাইসেন্সবিহীন তা বাজারজাত করায় প্রচলিত আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। এছাড়া যানবাহনে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, বিভিন্ন সময় সরকারি কাজে ব্যবহৃত ও বিএসটিআই কর্তৃক পেট্রোল পাম্প থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেলের নমুনা পরীক্ষা করে সঠিক মানের পাওয়া যায়নি।

এদিকে ফিলিং স্টেশনগুলো মানহীন তেল সরবরাহের পাশাপাশি পরিমাণে কম দিয়েও ভোক্তাদের ঠকানোর অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে পরিমাণে কম দেয়ার অভিযোগে ৩৯৯টি পাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করার পাশাপাশি ২৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া বিএসটিআইয়ের সার্ভিল্যান্স টিমের মাধ্যমে পেট্রোল পাম্পগুলো থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেল নিম্নমানের বলে প্রমাণ হওয়ায় ১৯৮৫ সালের বিএসটিআইয়ের অর্ডিন্যান্স ও সংশোধনী আইন, ২০০৩-এর ২৪ ধারা অনুযায়ী সম্প্রতি ১০ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রাজশাহীর আলম ফিলিং স্টেশন, চান্দা ফিলিং স্টেশন, সুমি ফিলিং স্টেশন, জিএম ফিলিং স্টেশন ও লতা ফিলিং স্টেশন; বরিশালের দোস্ত ট্রেডার্স ও মেসার্স ইসরাইল তালুকদার এবং রাজধানীর মেঘনা অয়েল সার্ভিসেস, আইডিয়াল ফিলিং স্টেশন ও শিকদার ফিলিং স্টেশন।

এদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত আন্ত:মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ভেজাল তেল বিক্রির অপরাধে ৯টি পেট্রোল পাম্পকে জরিমানা করা হয়েছে। পাম্পগুলো হচ্ছে, পদ্মা অয়েল কোম্পানির অধীনে ঢাকার যাত্রাবাড়িতে অবস্থিত সাহানা ফুয়েল, বগুড়ায় অবস্থিত জিবিকা ফুয়েল সেন্ট্রাল, ত্রিশা এন্টারপ্রাইজ, এম. আর. ট্রেডার্স, মেঘনা অয়েল কোম্পানির অধীনে সরদার ফিলিং স্টেশন, হক ফিলিং স্টেশন, যমুনা অয়েল কোম্পানির অধীন গাইবান্ধায় অবস্থিত বাধন ফিলিং স্টেশন, লক্ষ্মীপুরের মতিন ট্রেডার্স ও নওগাঁর নিউ খন্দকার স্টোর। এছাড়া ১০৩টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা অনুমোদন ছাড়াই তেল বিক্রি করছে।

বৈঠকে জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটি কিছু সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে, মেরিন বা বার্জ ডিলার নিয়োগে বিপিসির নীতিমালা অনুসরণ করা, ডিলারদের বিপণন কোম্পানি থেকে তেল উত্তোলনের হিসেব রাখা, তেল তোলার আগে কি পরিমাণ তেল ট্যাংকে মজুদ ছিল তার হিসেব রাখা, বার্জের ফ্লো মিটার বিএসটিআই এর মাধ্যমে চেক করা ইত্যাদি। এছাড়া বৈঠকে কনডেনসেটের দাম পুন: নির্ধারণ করা, এল পেটার্ন নির্ধারণ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এদিকে পরিবহন খাতের প্রধান সংগঠন বাস-ট্রাক মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা বলেছেন, তারা যে ডিজেল ব্যবহার করেন, তার মান এতই খারাপ যে এই জ্বালানির কারণে ভালো মানের (ইউরো-৩ কিংবা ৪) ইঞ্জিনসমৃদ্ধ যানবাহন আনতে পারছেন না।

তারা বলেন, দেশে সরবরাহ করা ডিজেলে সালফারের পরিমাণ প্রায় ২০০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)। অথচ পাশের দেশ ভারতে ব্যবহৃত ডিজেলে সালফারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ পিপিএম। অতিরিক্ত সালফারযুক্ত ডিজেল ব্যাপক বায়ুদূষণের কারণ। এ ছাড়া সালফারে যে পরিমাণ ‘সিটেন’ (ডিজেলের শুদ্ধতা পরিমাপক উপাদান) থাকার কথা, তাও থাকে না বলে পরিবহন মালিকদের অভিযোগ।

আন্ত:মন্ত্রণালয়ের ঐ বৈঠকে বিপিসির চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা (বর্তমানে সাবেক) নিজেই জ্বালানি তেলে ভেজাল থাকার কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, পেট্রোল-অকটেনে ভেজাল হিসেবে মেশানো হচ্ছে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া কনডেনসেট (উত্তোলিত গ্যাসের সঙ্গে পাওয়া তরল জ্বালানি)। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার কনডেনসেটের দাম ২৫২৬ টাকা হলেও দেশে সরকার নির্ধারিত দাম ৪২ টাকা। পেট্রোবাংলা এই দামে দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলোতে কনডেনসেট সরবরাহ করে। অপরদিকে প্রতি লিটার পেট্রোল-অকটেনের দাম যথাক্রমে ৯৬ ও ৯৯ টাকা। দামের এই পার্থক্যের কারণে ভেজাল দিলে লাভ বেশি হয়।

সূত্র বলছে, ভেজাল মেশানো ছাড়াও পেট্রোল-অকটেনের মান খারাপ। বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মানমাত্রা অনুযায়ী সেই জ্বালানিই অকটেন হিসেবে গণ্য হবে, যাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ অকটেন অণুকণা থাকবে। আর পেট্রোলে অকটেন অণুকণা থাকতে হবে অন্তত ৮৫ শতাংশ। তবে দেশের বাজারে সরবরাহ করা অকটেনে ৯০ শতাংশের কম এবং পেট্রোলে ৮০ শতাংশের কম অকটেন অণুকণা রয়েছে। তরল বাণিজ্যিক জ্বালানি হিসেবে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল। বছরে প্রায় ৫৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, এর অর্ধেকই ডিজেল। ডিজেল আবার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে।

বিপিসির সবেক চেয়ারম্যান বলেন, ডিজেলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত সালফারের মাত্রা ৫০০ পিপিএম। তবে এই মানের ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, কুয়েত থেকে যে ডিজেল আমদানি করা হয়, তাতে সালফারের মাত্রা ২০০০ পিপিএমের বেশি। দেশেও সামান্য কিছু ডিজেল তৈরি হয়। তাতেও সালফার থাকে বিএসটিআইয়ের মানমাত্রার তুলনায় বেশিই।

তিনি বলেন, উচ্চ মাত্রার সালফারযুক্ত এসব ডিজেলের সঙ্গে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা স্বল্প মাত্রার সালফারযুক্ত ডিজেল মিশিয়ে সরবরাহ করা হয়। তাতে ডিজেলে সালফারের মাত্রা ৮০০ পিপিএমের বেশি থাকে না বলে তিনি দাবি করেন। আর ডিজেলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত সিটেনের মাত্রা হচ্ছে কমপক্ষে ৪৫। কিন্তু দেশে সরবরাহ করা ডিজেলে এর চেয়ে সিটেন কম থাকে বলে স্বীকার করেন বিপিসির চেয়ারম্যান।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি পেট্রোল পাম্প ও জ্বালানি তেল বিক্রির বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে বলেছেন, প্রায় ৩৫০ ভেজাল তেল বিক্রিকারী পেট্রোল পাম্প চিহ্নিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বন্দর থেকে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেয়ার সময় ভেজাল মেশানোর কারণে জ্বালানির মান খারাপ হচ্ছে। এটা রোধ করতে সরকার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত তেল পরিবহনের জন্য পাইপলাইন বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, কেউ যদি ভেজাল করে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে লাইসেন্স বাতিল করা হবে। আমাদের কাছে রিপোর্ট চলে আসছে। পেট্রোল পাম্পের মধ্যে কোন কোন পাম্প ভেজাল করছে, আমরা ধীরে ধীরে তাদের লাইসেন্স বাতিলের দিকে যাব। এখন আর জরিমানা না, সরাসরি লাইসেন্স বাতিলের দিকে যাব।

এই সংবাদটি 1118 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ