উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

প্রকাশিত: ৩:২৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০১৬

উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা আরো প্লাবিত হয়ে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানির তোড়ে রাস্তাঘাট ভেঙে অনেক স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রেল লাইন ডুবে যাওয়ায় জামালপুর লাইনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সিরাজগঞ্জের ৬টি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার তাঁত কারখানা পানিতে ডুবে আছে। পানিবন্দী মানুষ সুপেয় পানি ও খাদ্যাভাবে চরম সঙ্কটে পড়েছেন। কোথাও কোথাও ত্রাণবিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি অল্প। নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। অপরদিকে পানিবাহিত রোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
শেরপুর সংবাদদাতা : প্রবল বেগে ব্রহ্মপুত্র ও দশআনী নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে শনিবার শেরপুরের সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের ৩০ গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামের ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ও খেতের আবাদ পানিতে তলিয়ে গেছে। শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
সরেজমিনে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার সকালে প্রবল বেগে ব্রহ্মপুত্র ও দশআনী নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্রহ্মপুত্র নদসংলগ্ন সদর উপজেলার কামারেরচর, চরমোচারিয়া, চরপক্ষীমারী, বলাইরচর ও বেতমারি-ঘুঘুরাকান্দি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এর মধ্যে চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের ১০টি, কামারেরচর ইউনিয়নের ৭ নং চর, ৬ নং চর, গোয়ালপাড়া, পয়স্তিরচর, গুচ্ছগ্রাম, দেওপাড়া, শাহাব্দীর চরের একাংশ ও নিজকামারেরচর গ্রাম, বলাইরচর ইউনিয়নের ২টি, বেতমারী-ঘুঘুরাকান্দি ইউনিয়নের ২টি এবং চরমোচারিয়া ইউনিয়নের মুন্সিরচর, হরিণধরা, টানকাছার, চরবাবনা, নলবাইদ, টালিয়াপাড়া ও মুকসুদপুর গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের ১০ হাজার মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বন্যা কবলিত বিস্তীর্ণ এলাকার উঠতি পাট, রোপা আমন বীজতলা, সবজী ও আউশ আবাদ পানিতে তলিয়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির কোন হিসাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের পোড়ারদোকান এলাকায় ডাইভারশন সড়কের ওপর দিয়ে দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতায় প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এই সড়কে যানবাহনগুলো ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
গতকাল বিকেলে সরেজমিনে পরিদর্শনকালে চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের ধানুরপাড়া গ্রামের মো. আব্দুল মজিদ বলেন, তাঁর এক একর জমির পাট ও সবজি আবাদ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়িঘরে পানি ওঠেছে।
এ সময় জঙ্গলদী গ্রামের মোশাররফ হোসেন বলেন, তার এক একর জমির আমন বীজতলা ও সবজি আবাদ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে।
কুলুরচর ব্যাপারিপাড়া গ্রামের আবু জাফর বলেন, তাদের গ্রামের প্রায় এক হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।
চরমোচারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. খোরশেদুজ্জামান শনিবার বিকেলে বলেন, বন্যার পানির তোড়ে তার ইউনিয়নের অধিকাংশ কাঁচা সড়ক ভেঙ্গে গেছে। কামারেরচর ও চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান যথাক্রমে মো. হাবিবুর রহমান ও মো. আব্দুর রউফ বলেন, বন্যা কবলিত মানুষ এখন নৌকায় চলাফেরা করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), শেরপুরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রফিকুল আলম চৌধুরী ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা বিপদসীমার শূন্য দশমিক ৭৪ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অপরদিকে, শেরপুর সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান গতকাল শনিবার বিকেলে বলেন, শেরপুরের তিনটি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। এসব এলাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণের কাজ চলছে। আজ রোববার কামারেরচর ইউনিয়নে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে বলে তিনি জানান।
কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে আব্দুল মজিদ : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল ও যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কাজিপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর ফলে বন্যা কবলিত কাজিপুর চরাঞ্চালের মানুষ গবাদিপশু নিয়ে চরম ভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত বুধবার থেকে উপজেলার বাঐখোলা গ্রামের কাছে দুজায়গায় ও রতনকান্দি হাটের পূর্ব পাশে ওয়াপদার বাঁধের নিচে পানি চুইয়ে পড়তে দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয় খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ও এলাকাবাসীর সহযোগীতায় উজানে বাশ পুঁতিয়ে বালির বস্তা ফেলার কারণে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। বন্যার দরুন উপজেলার ৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ও মেঝেতে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সব স্কুল মল্লিকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যুক্তিগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বুরুঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাদবোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বীরশুভগাছা উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘাটিশুভগাছা চরপাচানীছয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ভাটিমেওয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এইসব বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া আরও ৮টি মাদরাসা ও হাইস্কুলে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে রাজনাথপুর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খাসরাজবাড়ি দাখিল মাদরাসা, মজনাবাড়ি হাইস্কুল, নিশ্চিতপুর হাইস্কুল, খাসশুড়িবেড় হাইস্কুল, কান্তনগর হাইস্কুল, গোয়ালবাথান হাইস্কুল ও রেহাইশুরিবেড় হাইস্কুলে বন্যার পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। উপজেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ৭৪টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্থ, ৯৫২৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ, ৫১,৬০৫ জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত ও ৩৬৮৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলের জমি বন্যায় নিমজ্জিত হয়েছে, ৮৭৫ টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে এবং আংশিক ২৭৫৫ টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুর রহমান জানান যে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে শুকনা খাবার ক্রয়করে ২০০ টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। ৫০ হাজার টাকা ও ৮ মেট্রিক টন চাল খাসরাজবাড়ি ও চরগিরিস ইউনিয়নে প্রতি পরিবারকে নগদ ৫০০ টাকা ও ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নে ২৫০ টি এবং নিশ্চিতপুর ইউনিয়নে ২৫০টি পরিবার প্রতি পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। মাইজবাড়ি ও কাজিপুর ইউনিয়নে ৬০০ পরিবারকে প্রতি পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল ও ৬০টি পরিবারকে প্রতি পরিবারকে ১০০০ হাজার টাকা করে মোট ৬০,০০০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আরও বরাদ্দ আছে এগুলো দু-এক দিনের মধ্যে বিতরণ করা হবে বলে জানা গেছে।
সিরাজগঞ্জ থেকে আবদুস সামাদ : গতকাল শনিবার সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে যমুনা নদীর পানি সামান্য বৃদ্ধি পয়েছে। পানি কম বাড়লেও সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে শনিবার সকালে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। বন্যায় জেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এখন দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে।
অব্যাহত ভাবে পানি বৃদ্ধির কারণে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, এনায়েতপুর ৫ উপজেলা চরাঞ্চলের ৩৩টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম এবং এই সব এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিনই জেলার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল বানের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে বন্যা কবলিতরা এখন দুর্বিসহ জীবন যাপন করছে। সরকারিভাবে যে ত্রাণ দেয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে বানভাসী মানুষেরা জানিয়েছে।
এদিকে যমুনার পানি বৃদ্ধির পর থেকে সদর, বেলকুচি ও চৌহালীতে শুরু হয়েছে নদী ভাঙ্গন। বিশেষ করে চৌহালীতে এখন ভাঙ্গন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই উপজেলার ব্রাহ্মনগ্রাম, ঘোরজান, পাঁচিলসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে শুরু হয়েছে মারাত্মক নদী ভাঙ্গন। ইতোমধ্যে এ সকল গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। অনেকে তাদের বাড়িঘর রক্ষা করতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। ভাঙ্গন কবলিতরা সব কিছু হারিয়ে এখন দিশেহারা। তারা অভিযোগ করেছে, বাড়িঘর না থাকায় খোলা আকাশের নিচে থাকলেও তাদের জন্য কোন ত্রাণসামগ্রী আসেনি। যে কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে আর অনাহারে জীবন যাপন করছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ওয়ালি উদ্দিন জানান, সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলায় ৩৩টি ইউনিয়নের প্রায় শতাধীক গ্রামের কমপক্ষে সাড়ে ১৫ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছে। এছাড়া ১৫শটি বাড়িঘর আংশিক ও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য ১৩৯টি কেন্দ্রে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলার ৫টি উপজেলার বন্যা কবলিতদের মাঝে ৩৭০ মেট্রিকটন চাল ও ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী জানালেন, উপজেলার কয়েকটি গ্রামে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। নদীতে তীব্র স্রোতের কারণেই এই ভাঙ্গন চলছে। এই মুহূর্তে নদীতে প্রচুর পানি থাকার কারণে ভাঙ্গন রোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার উপায় নেই। তবে চৌহালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়েছে।
ডুবে এক শিশুর মৃত্যু
গত শুক্রবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে এক শিশুর করুন মৃত্যু হয়েছে। মৃত তৃষা খাতুন (৪) এই উপজেলার সলপ গ্রামের সেলিম রেজার মেয়ে। শুক্রবার বিকেলে এই ঘটনাটি ঘটে।
তৃষার চাচা কামরুল ইসলাম জানান, বন্যার কারণে বাড়ির পাশে পানি উঠেছে বেশ কয়েকদিন ধরে। শুক্রবার দুপুরে বাড়ির বন্যার পানির কাছেই খেলা করছিলো শিশু তৃষা। সকলের অজান্তে কোন এক সময় তৃষা বন্যার পানিতে পড়ে যায়। এরপর থেকেই সে নিখোজ ছিলো। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিকেলে পানিতে তার লাশ ভেসে উঠলে এলাকাবাসী তা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
গাইবান্ধা সংবাদদাতা : ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ২২.৫১ সে: মি. এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২০.৬০ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের সিংড়িয়ার রতনপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী  ইউনিয়নের সিংড়িয়া পয়েন্টে শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় বন্যার পানির তোড়ে বাঁধটি ভেঙ্গে গেছে। হঠাৎ করে বাঁধটি ভেঙ্গে যাওয়ায় রতনপুর গ্রামের অনেক মানুষের বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র ও মজুদ ধান-চাল বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এতে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া, উদাখালি, উড়িয়া এবং সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ও বোয়ালি ইউনিয়নের বিস্তৃত এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে এসব এলাকার ৫০ হাজার মানুষ এখন নতুন করে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়ি-ঘর হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত। এছাড়া এসব এলাকার রোপা আমন, আমন বীজতলা, পাট, শাক সব্জি পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে বন্যার পানির তোড়ে ফুলছড়ি উপজেলার চন্দ্রনস্বর গুচ্ছ গ্রামটি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বন্যা কবলিত গৃহহীন পরিবারগুলো ফুলছড়ি উপজেলা হাইস্কুল মাঠে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার পানির তোড়ে রতনপুর-বাদিয়াখালি সড়কের হাজিরহাট সংলগ্ন ব্রীজটি ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া কাতলামারি, সিংড়িয়া, উদাখালী, গুণভরি সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ফুলছড়ি উপজেলার সাথে গ্রামের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের পৌর এলাকার কুটিপাড়া, ডেভিড কোম্পানীপাড়া ও গোদারহাটের ৮টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাঁধ দিয়ে এখনও পানি চোয়াচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং লোকজন বাঁধ পাহারা দিচ্ছে। এ নিয়ে শহরবাসি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
সিভিল সার্জন ডাঃ নির্মলেন্দু চৌধুরী জানান, বন্যা কবলিত ৪টি উপজেলায় ৬৫টি মেডিকেল টিম স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত রয়েছে।
ফরিদপুর সংবাদদাতা : গত কয়েদিন পদ্মার পানি বেড়ে এখন বিপদসীমার ৯৬ সে.সি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফরিদপুর জেলার তিনটি উপজেলা ১১টি ইউপির অধিকাংশ জায়গা তলিয়ে গেছে। ফরিদপুর সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের অর্ধলক্ষ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে এসব এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট পানির নীচে তলিয়ে গেছে।
শুক্রবার বিকালে ফরিদপুর সদরের আলীয়াবাদ ইউপির ভাজনডাঙ্গা পদ্মা নদীর সংলগ্ন এলাকার বেড়ী বাধ ভাঙ্গনের মুখে পরে। পরে প্রশাসন ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সহায়তায় বালির বস্তা ফেলে সেটাকে প্রাথমিক ভাবে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা চলছে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার ইদ্রিস আলী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি ২১ সে. মি. বৃদ্ধি পেয়ে  বিপদসীমার ৯৬ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (এনডিসি) রুবায়েত হায়াত শিপলু জানান, ফরিদপুর সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় বন্যাদুর্গতদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৫ মে.টন চাল ও ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জামালপুর সংবাদদাতা : জামালপুরে যমুনা ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ৫ সেঃ মিটার  বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ১শ ২১ সেঃ মিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ-দুরমুঠ রেওয়ে স্টেশনের মাঝে রেল লাইন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর মহাসড়কে বেশ কয়েক স্থানে পানি উঠছে। যে কোন মুহূর্তে ট্রেন ও সড়ক পথের চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জেলায় ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে এ যাবত প্রায়  ৩৬টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি বাড়িতে অথৈই পানি। ত্রাণের জন্য চলছে সর্বত্রই হাহাকার। কোন লোকজন দেখলে অসহায়, অভাবী বন্যার্ত মানুষ ছুটে এসে বলে আমকে ত্রাণ দাও। তারা আঞ্চলিক ভাষায় বলেন” বাপু আমার নাইগ্যা নামড়া লেইখা নেও, আংগরে ঘরে ধান চাইল সব আছে, বাড়িঘরে পানি, আন্দাবারি নাই। কথাগুলো বলছিলেন, ইসলামপুর চিনাডুলি ইউনিয়নের ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেওয়া, মরিয়ম বেগম, এদিকে ৭টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে অসংখ্য পুকুর ডুবে মাছ বেরিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে মৎস্য চাষিরা। জেলার দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী ও মেলান্দহ উপজেলার অধিকাংশ যমুনা দ্বীপগুলোয় ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এদিকে জেলার ৩ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যার কারণে বন্ধ রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।

এই সংবাদটি 537 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ