উত্তরাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতি

প্রকাশিত: ৫:৫৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০১৬

উত্তরাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতি

উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, পাবনাসহ জামালপুর ও ফরিদপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একদিকে পানি বৃদ্ধি আরেক দিকে নদীভাঙন। বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র ও বাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। আর যারা কোনো আশ্রয় পাননি তারা এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারিভাবে যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তাতে বন্যার্তদের চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য। কোনো কোনো এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের দেখা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট যেমন রয়েছে তেমনি ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ। পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বিঘ্ন হচ্ছে। উভয় ঘাটে পারাপারের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে শত শত যানবাহন। যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুড়িগ্রাম, রৌমারী, চিলমারী, নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী : টানা ১০ দিন ধরে জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির মারাÍক অবনতি হয়েছে। বুধবার সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৮৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বেড়েছে তিস্তাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও। বন্যার পানিতে ডুবে কুড়িগ্রাম সদর ও নাগেশ্বরী উপজেলায় ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
nadia laibari add
রৌমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুজিবর রহমান জানান, মঙ্গলবার মধ্যরাতে বাঘমারা গ্রামে রৌমারী শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে গোটা উপজেলা চত্বর, উপজেলা ভূমি অফিস, পোস্ট অফিস, রৌমারী বাজার, রৌমারী ডিগ্রি কলেজ, রৌমারী সিজি জামান উচ্চ বিদ্যালয়সহ ৮টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। ফলে কার্যত রৌমারী উপজেলার সব ধরনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অপরদিকে রাজীবপুর উপজেলা চত্বর, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস, খাদ্যগুদাম, পোস্ট অফিস, রাজীবপুর বাজার ও রাজীবপুর ডিগ্রি কলেজেও পানি ঢুকেছে।

কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কে আশ্রয় নেয়া আবেদ আলী জানান, বাড়িতে ৭-৮ দিন কষ্ট করে থাকার পর ২ দিন ধরে পাকা সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। কোনো চেয়ারম্যান-মেম্বারের দেখা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। কুড়িগ্রাম পৌরসভায় ত্রাণের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষুব্ধরা মেয়রের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সহকারী প্রকৌশলী আবদুল আউয়ালকে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

লালমনিরহাট : কাঁটাতারের দিকে তাক করে থাকা বন্দুকের নল আর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ রাঙানি- কোনো কিছুই যেন বাধা হতে পারেনি মানবতার কাছে। প্রবল বন্যায় স্রোতের তোড়ে আসা ভারতীয় বানভাসি মানুষকে আশ্রয় দিয়ে সেই মানবতারই জয়গান তুলেছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোঘলহাট এলাকার বাসিন্দারা। ভারতের বিপদাপন্ন লোকজনকে মানবিকভাবে গ্রহণ করেই সাহয্যের হাত বাড়িয়েছেন তারা। আর তাই বাংলাদেশীদের মহানুভবতায় কৃতজ্ঞ ভারতের ওইসব বানভাসি মানুষ। তবে প্রবল বন্যায় বিপদাপন্ন ভারতীয় নাগরিকরা এ দেশে আশ্রয় গ্রহণ করলেও লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন কিংবা বিজিবি তাদের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানাতে পারেনি।

ভারত থেকে লালমনিরহাটের মোগলহাট হয়ে প্রবেশ করা ধরলা নদীর পানি গত কয়েকদিন ধরেই বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে ভারতের কুচবিহার জেলার বানভাসি বিপন্ন মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার মোগলহাট ও আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বুধবার সরেজমিন মোগলহাটের চওড়াটারি গ্রামে গিয়ে কথা হয় ভারত থেকে আসা বানভাসিদের সঙ্গে। তারা বলেন, পানি কমলে তারা তাদের ঘরে ফিরে যাবেন।

ডিমলা (নীলফামারী) : তিস্তার পানি বৃদ্ধি ও ভাঙন অপরিবর্তিত রয়েছে। উজানের ঢলে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ১৬টি গ্রামের ভেতর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া তিস্তার ভাঙনে বুধবার বিকালে নতুন করে চরখড়িবাড়ি এলাকার ৮০টি পরিবার বাঁধে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

গাইবান্ধা : জেলায় বুধবার বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে। ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যাকবলিত ইউনিয়নের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এখন ৩৩। বুধবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সাবেক ফুলছড়ি থানা সদর এবং বাজার এখন পানির নিচে। বন্যার পানিতে ডুবে বুধবার সকালে ফুলছড়ি উপজেলার উত্তর খাটিয়ামারি চরে লালচান নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন।

জামালপুর, সরিষাবাড়ী, বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ ও মাদারগঞ্জ : যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যমুনার পানি ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে করে পাঁচ উপজেলার ২৭টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছে ১৯১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
http://somoychitro.com/wp-content/uploads/2016/07/logo-new-potaka.jpg
যমুনা নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ।

ফরিদপুর : চরভদ্রাসন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় উপজেলার পদ্মা নদী পয়েন্টে বন্যার পানি বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে ফরিদপুর পাউবো সূত্র জানায়। এতে প্রায় দেড় হাজার পরিবার পানিবন্দি ও প্রায় ২শ’ একর জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার চরাঞ্চলের ৫টি কাঁচা রাস্তা ডুবে গেছে এবং ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ওঠার ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জ ও শাহজাদপুর : যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিরাজগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বর্তমানে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইমাম হাসান বলেন, এভাবে যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। প্রবল বর্ষণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অনেক স্থানে ধসের আশংকায় লাল নিশান উড়ানো হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যমুনা নদীর তীরবর্তী ৫টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যাকবলিতদের জন্য ১৩৯টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বেশকিছু আশ্রয় কেন্দ্রে অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

মাদারীপুর : শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটের পদ্মা নদীতে অব্যাহত পানি বেড়ে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোত অব্যাহত থাকায় ফেরিসহ নৌযানগুলোর ২ থেকে আড়াই কিলোমিটার উজান বেয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ সময় বেশি লাগছে। ফেরি চলাচলে অচলাবস্থার কারণে কাওড়াকান্দি ঘাটের ৪ কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনসহ উভয় ঘাটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়ে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পয়েন্টে পদ্মার পানি বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

সুজানগর (পাবনা) : সুজানগর উপজেলায় অতিবর্ষণে আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সুনামগঞ্জ, তাহিরপুর ও দোয়ারাবাজার : সুনামগঞ্জে বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ, ছাতক ও তাহিরপুর উপজেলার নিুাঞ্চলের পানি নামতে শুরু করেছে। বুধবার সকাল ৯টায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক লুৎফুর রহমান জানান, দুর্গতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ১২৬ টন চাল, শুকনা খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে তাহিরপুরের এক স্কুল শিক্ষার্থী। নিহতের নাম, মো. আলহাজ মিয়া (৮)। সে উপজেলার বাদাঘাট উত্তর ইউনিয়নের ঘাগটিয়া জালোরটেকের সফিক উদ্দিনের ছেলে এবং ঘাগটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী।

এই সংবাদটি 671 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ