নজরদারিতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় দু’বছর অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর তালিকা চেয়েছে সরকার

প্রকাশিত: ৩:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০১৬

৪০ ছাত্রের তথ্য তলব * ক্লাসে ১০ দিন অনুপস্থিত থাকলে তথ্য জানাতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে * বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিদের নিয়ে শিগগিরই বৈঠক
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মিত ও দু’বছর ধরে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর তালিকা চেয়েছে সরকার। এছাড়া মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ন্যূনতম ১০ দিন অনুপস্থিত থাকলেই তাদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
একই উদ্দেশে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে কূটনৈতিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কঠোর নজরদারি করা হবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হচ্ছে। আমরা সরকারকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পাশাপাশি আমরা নিজ উদ্যোগে কর্মরত ও শিক্ষকদের ব্যাকগ্রাউন্ড খোঁজখবর নেব। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে গত দু’বছর অনুপস্থিত ছিল এমন ছাত্রদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। যদিও এটা প্রস্তুত করা কঠিন। এরপরও আমরা তালিকাটি তৈরি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের ৩০-৪০ জন ছাত্রের ব্যাপারে তথ্য চাওয়া হয়েছে। আসলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ছাত্রের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। আমরা সেসব তথ্যও সরবরাহ করছি। রোববার বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিন আতংকের কারণে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি কম ছিল বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক (জনসংযোগ) বেলাল আহমেদ বলেন, এর আগে পরপর দুই সেমিস্টার অনুপস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল হতো। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনই ট্রাস্টি বোর্ডের (বিওটি) জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরের পর শুরু হওয়া ওই সভা রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলে।
গত বছরের অক্টোবরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) দুই সদস্যের একটি দল। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির লাইব্রেরিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরিরের কিছু বইয়ের সন্ধান পায়। তদন্ত দলের এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, আমরা ওইসব বই পুড়িয়ে ফেলে তা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসিকে জানাতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা ওই নির্দেশনা অনুসরণ করেনি। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান রোববার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ওই তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে শুধু ইসলামিক বই নয়, রামায়ণ, মহাভারত থেকে শুরু করে অন্যান্য ধর্মের বইও আছে। এটা কী থাকতে পারে না? তিনি দাবি করেন, জঙ্গিবাদে উস্কানি দেয়ার মতো কোনো বই তাদের লাইব্রেরিতে নেই।
সম্প্রতি দেশে বড় দুটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় জড়িতদের অধিকাংশই বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মধ্যে ৭ জুলাই ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতের কাছে পুলিশ ও হামলাকারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় নিহত জঙ্গি আবীর রহমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে নিহত জঙ্গি নিরবাস ইসলাম ইন্টারন্যাশনাল তার্কিশ হোপ ও নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একই ঘটনায় নিহত জঙ্গি মীর সাবিহ মোবাশ্বের ও রোহান ইমতিয়াজ ইসলাম রাজধানীর স্কলাস্টিকা স্কুলের ছাত্র। একইদিন জিম্মি থেকে ছাড়া পাওয়া ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহে থাকা প্রকৌশলী আবুল হাসানাত রেজা করিমও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে নাশকতা চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার বাংলাদেশী তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিসও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিল। এমনকি গত বছরের ১৪ ফেব্র“য়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার সঙ্গে যে ৫ জনের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে তারা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। নাফিসসহ এই ছয়জন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ইইই) ছাত্র ছিল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আর কেউ জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকেছে কিনা তা জানা সরকারের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। সে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনশৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অংশ নেয়া একটি সূত্র জানায়, এ যাবত গ্রেফতার জঙ্গিদের মধ্যে স্কলাস্টিকা স্কুলের ১৪তম ব্যাচের এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ও ইটিই বিভাগের ছাত্র বেশি। যে কারণে এ দুই প্রতিষ্ঠানের দিকে সন্দেহের তীর প্রবল। ওই সূত্র আরও জানায়, এ কারণে এই দুই প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যাচের সব ছাত্রদের বিষয়ে খোঁজ নেয়ার জন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এসব ব্যাচের ও বিভাগের আর কে কোথায় কী করছে, কে মিসিং আছে সেসব তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা : ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ১০ দিন বা তার বেশি ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। তিনি বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে করণীয় নিয়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা হবে। সরকারের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ হিসেবেই এটি করা হবে। তিনি সন্তানের প্রতি ভালোভাবে খেয়াল রাখতে বাবা-মায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভালোবাসা, আদর ও মমতা দিয়ে তাদের বড় করতে হবে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশমতো সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ব্যাপারে তথ্য দিতে রোববার রাতেই চারটি অধিদফতরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছক আকারে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর তথ্য দিতে হবে। এজন্য চিঠির সঙ্গে আলাদা দুটি ছক পাঠানো হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এমন তালিকা পাওয়ার পর গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানো হবে।
এছাড়া জঙ্গিবাদ ইস্যুতে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের ভিসিদের নিয়ে শিগগিরই একটি বৈঠক করবে মন্ত্রণালয়। এসব বিষয়ে দু-একদিনের মধ্যে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২৪ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। তাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও প্রতিকার কমিটির বৈঠকের সুপারিশ উল্লেখ করে দুটি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে বৈঠক। অপরটি ছিল মাদ্রাসার পাঠ্যবই পরিমার্জন। শেষেরটির বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৯টি কমিটি কাজ করছে। কিন্তু ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করার চিন্তাভাবনা চলছে। তবে রোববার পর্যন্ত দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।

এই সংবাদটি 536 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ