গুলির পরও কোপানো হয় জিম্মিদের : তারুশীর দেহে ৪০টি আঘাত -ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ

প্রকাশিত: ৪:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০১৬

গুলির পরও কোপানো হয় জিম্মিদের : তারুশীর দেহে ৪০টি আঘাত -ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ
গুলশানের হত্যাযজ্ঞে চরম নৃশংসতা ও বিবেকহীন উন্মাদনা দেখিয়েছে জঙ্গিরা। হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী ওই জঙ্গিরা সেদিন ২০ জনকে হত্যা করার সময় পৈশাচিক মনোবৃত্তির প্রকাশ ঘটিয়েছে। জঙ্গিরা ৭ জনকে গুলি করে ও অন্যদের কুপিয়ে হত্যা করে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও জিম্মিদের কোপানো হয়। এদের মধ্যে ভারতের তারুশী জৈনের শরীরে গুলি ছাড়াও ৪০টি কোপের আঘাত পাওয়া গেছে। এমনকি একজন জিম্মির মৃতদেহ রেস্তোরাঁর ডিপফ্রিজেও ঢুকিয়ে রাখে জঙ্গিরা। নৃশংসতার এমন ভয়ংকর চিত্র পাওয়া গেছে নিহতদের ময়নাতদন্তকারী একজন চিকিৎসকের বক্তব্য থেকে।
এদিকে হামলার আগে জঙ্গিরা কোনো ধরনের শক্তিবর্ধক ও বেপরোয়া মনোবৃত্তি সৃষ্টিকারী ওষুধ সেবন করেছিল কিনা তা জানতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগকে চিঠি দিয়েছে পুলিশ। বুধবার আদালতের মাধ্যমে এ চিঠি দেয়া হয়। ইতিমধ্যে নিহত জঙ্গিদের শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনা মহাখালীতে রাসায়নিক পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যকৃৎ, কিডনি, পাকস্থলী ও পাকস্থলীতে থাকা খাবার। পরীক্ষার জন্য মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই একই ধরনের খাবারের নমুনা এবং ভারতের একটি সংস্থা ভিসেরা নমুনা চেয়েছে বলে জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বুধবার যুগান্তরকে জানান, পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত থেকে বুধবার তাদের একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে জঙ্গিরা মাদকাসক্ত ছিল কিনা, থাকলে তাদের শরীরে কি ধরনের মাদকদ্রব্য ছিল সেটা জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৫ জন জঙ্গির পক্ষে ২০ জন মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করা স্বাভাবিক বিষয় নয়। গরম রক্তের ওপর আরেকজনকে ফেলে রেখে গলাকাটা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে অসম্ভব। মৃত্যুর পরও তারা (জঙ্গিরা) মৃতদেহগুলোকে বিকৃত করেছে। নিহত জঙ্গিরা কোনো বিশেষ ধরনের মাদকে আসক্ত ছিল কিনা সেটা জানার জন্য আমরা আগেই তাদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছি। মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এসব নমুনা পরীক্ষা শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে ডিএমপির উপকমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, বিদেশী দুটি সংস্থা পরীক্ষার জন্য জঙ্গিদের শরীরের নমুনা চেয়েছে। তাদের কিছু নমুনা পাঠানো হতে পারে। ডিএমপি সূত্র জানায়, এফবিআই ও ভারতের গুজরাটের একটি প্রতিষ্ঠান নিহত ৫ জঙ্গির ভিসেরা নমুনা চেয়ে পাঠিয়েছে। সেই ৫ জঙ্গি হচ্ছে মীর সামিহ মোবাশ্বের (১৯), রোহান ইমতিয়াজ (২০), নিবরাস ইসলাম (২০), খায়রুল ইসলাম পায়েল (২২) ও শরিফুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ (২৬)। নিহতদের মধ্যে তিনজন বোমার আঘাতে ও দু’জন গুলিতে নিহত হয়। গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে এদের জেএমবির নেতাকর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের যোদ্ধারা ওষুধের নামে বিভিন্ন মাদক সেবন করে। ক্যাপটাগনজাতীয় এসব ওষুধ ‘আইএস ড্রাগ’ হিসেবেও পরিচিত। এসব ওষুধ সেবনের ফলে তারা দিনের পর দিন জেগে থাকে এবং ঠাণ্ডা মাথায় নির্মমভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গুলশান হামলায় অংশ নেয়া জঙ্গিদেরও কোনো মাদকদ্রব্য সেবন করানো হয়েছিল কিনা তা জানার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে জাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রশাসন বিভাগের সাবেক ডিন আবম ফারুক যুগান্তরকে জানান, কিছু মাদকদ্রব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, এগুলো সেবনকারীরা একমুখী চিন্তা করে। তারা অন্যকিছু চিন্তা করতে পারে না। তাদের মধ্যে মানবিকতা লোপ পায়।
৬ লাশ এখনও মর্গে : গুলশান থানা পুলিশ জানায়, মর্গে থাকা ৬ জঙ্গির লাশ এখনও মর্গে পড়ে আছে। তারা হচ্ছে মীর সামিহ মোবাশ্বের, রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শরিফুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ ও সাইফুল চৌকিদার ওরফে শাওন। এর মধ্যে শাওনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে এবং অন্যদের লাশ সিএমএইচের মর্গে আছে।
গুলশান থানার পরিদর্শক সালাহ উদ্দিন বুধবার যুগান্তরকে জানান, জঙ্গিদের কারও লাশ নেয়ার জন্য বুধবার পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেনি। এছাড়া ৩ জুলাই ৩ বাংলাদেশী, ৯ ইতালিয়ান ও ৭ জাপানি এবং এক ভারতীয় জিম্মির লাশ দূতাবাস এবং তাদের আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দুই জঙ্গির লাশ নিতে চায় পরিবার : যুগান্তরের বগুড়া ব্যুরো জানায়, নিহত জঙ্গিদের মধ্যে বগুড়ার খায়রুল ইসলাম পায়েল  ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলের লাশ নিতে চায় তাদের পরিবার। পুলিশ লাশ হস্তান্তর করলে তাদের বাড়ির কাছে কবরস্থানে দাফন করা হবে। বুধবার উজ্জ্বলের বাবা বগুড়ার ধুনটের ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াজান চল্লিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য বদিউজ্জামান জানান, তার ছেলে সরকারি আযিযুল হক কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র ছিল। ঢাকার আশুলিয়ার শাহজাহান মার্কেট এলাকার মাদারী মাদবর কেজি স্কুলে শিক্ষকতা করত সে। মারা যাওয়ার পর পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। উজ্জ্বলের মা-বাবার শরীর থেকে রক্তের নমুনা নেয়া হয়েছে। বদিউজ্জামান জানান, পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে বলেছেন, উজ্জ্বলের লাশ দাফনের জন্য বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হবে। তাই তারা লাশের অপেক্ষায় আছেন।
একই জেলার বগুড়ার শাজাহানপুরের চুপিনগর ইউনিয়নের বৃ-কুষ্টিয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন ও পিয়ারা বেগমের ছোট ছেলে খায়রুল ইসলাম পায়েল স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করে। কামারপাড়া গ্রামের জনৈক আবদুর রহমানের ছেলে আবদুল হাকিম তাকে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়ার নামে ডেকে নিয়ে যায়। গত ডিসেম্বরে হাকিমের সঙ্গে সে শেষবার বাড়িতে যায়। এরপর থেকে বাড়ির কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। ৫ জুলাই বগুড়া ডিবি পুলিশ আবুল হোসেন ও পিয়ারা বেগমকে ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা পায়েল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ ও লাশ শনাক্তের জন্য দু’জনের শরীর থেকে রক্ত নেয়। কিন্তু তারা পায়েলের লাশ দেখতে পারেননি। পরদিন পুলিশ তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। পায়েলের বোন হোসনে আরা জানান, তারা লাশ ফেরত চান।
এদিকে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কুলকাঠি গ্রামের হাসিম চৌকিদারের ছেলে সাইফুল চৌকিদার। হামলার পর তার আত্মীয়স্বজনদের ঘটনাস্থলে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর পরিবারের কেউ লাশ নিতে যায়নি। তার মা মাকসুদা বেগম ও বাবার নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

এই সংবাদটি 540 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ