৫ বছরে বজ্রপাতে মারা গেছে ১ হাজার ২৯৪ মানুষ

প্রকাশিত: ২:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০১৬

কামাল উদ্দিন সুমন : আশংকাজনক হারে বেড়েছে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা। গত ২৪ ঘন্টায়ই মারা গেছে ৪৫ জন মানুষ। হঠাৎ করে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনায় মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে আতংক। বিশেষ করে খোলা জায়গায় বিদ্যুৎ চমকালে মানুষের আতংক বেড়ে যায়। আবহাওয়া অধিদফতরের কাছে বজ্রপাতে এ পর্যন্ত কতজন মানুষ মারা গেছে তার পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি সংস্থা দুর্যোগ ফোরাম বলছে, গত ৫ বছরে সারা দেশের বজ্রপাতে মারা গেছে ১ হাজার ২৯৪ জন। সর্বশেষ গতকাল দুপুরে সাভার ও ধামরাইয়ে মন্টু(১৯) ও মনির হোসেন(১৩) এবং নওগাঁয়ে ইব্রাহিম(১৪) ও সচীন মহুরী (৬০) বজ্রপাতে মারা গেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বালাদেশ অতিমাত্রায় বজ্রপাতপ্রবণ। এছাড়া বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং মোবাইল কোম্পানীর টাওয়ারের কারণে বেড়েছে বজ্রপাতের ঘটনা।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে ২০১১ সালে ৯৭৮, ২০১২ সালে ১ হাজার ২১০, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪১৫, ২০১৪ সালে ৯৫১ ও ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৮ বজ্রাঘাত হয়েছে। ৫ বছরে ৫ হাজার ৭৭২টি অর্থাৎ গড়ে ১১৫৪ বার করে বজ্রপাত হয়েছে।

দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়া সংসদে বলেছিলেন, বজ্রপাতে দেশে প্র্রতিবছর তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ লোক মারা যায়। আর দুর্যোগ ফোরামের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে , ২০১১ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১৩ সালে ২৮৫ জন, ২০১৪ সালে ২১০ ও গত বছর ২৭৪ জন নিহত হয়েছে। চলতি বছরের গতকাল ১৩ মে পর্যন্ত মারা গেছে ১১৪ জন নিহত হওয়ার কথা বলছে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দেশে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে। গত এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪ ডিগ্রিসেলসিয়াস তাপমাত্রা বেশি ছিল। গড় তাপমাত্রা বাড়ার আনুপাতিক হারে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি বজ্রপাত হওয়ার পাশাপাশি আগামীতে বাংলাদেশে এর পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঞ্চালনশীল গভীর মেঘমালার সংঘর্ষের ফলে বজ্রপাত হয়। এখনই বজ্রপাতের সময়। খোলা মাঠে যারা থাকেন তারাই এতে বেশি আক্রান্ত হন। তাই বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে না থাকার পাশাপাশি মোবাইল ফোনে কথা না বলার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। বজ্রপাত বন্ধ করা যাবে না কেবল সচেতন হলেই ক্ষয়ক্ষতি কমে যাওয়ার কথা বলছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের থাবায় বাংলাদেশ অতিমাত্রায় বজ্রপাতপ্রবণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে এবং আগামীতে তা আরও বেড়ে যেতে পারে বলেও উল্লে¬খ করা হয় গবেষণাটিতে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একটি গবেষণামূলক জরিপ মোতাবেক বাংলাদেশে মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়ে থাকে। বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক বা কৃষিজীবী মানুষ (প্রায় ৫১%) এবং ফসলের মাঠে কর্মরত অবস্থায় অধিকাংশ কৃষক বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বজ্রপাতের শিকারের প্রায় ১১% হলো স্কুল শিশু, স্কুলে যাওয়া আসার পথেই এ ঘটনার শিকার হয়। বজ্রপাতের প্রায় ২২% মানুষ ঘরে থাকা অবস্থায় মারা যায়। তাছাড়া বজ্রপাত আঘাতের শিকার হয় প্রায় ১২% রাস্তাঘাটে এবং প্রায় ১৪% পানিতে থাকা অবস্থায়।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডবিস্নউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলেন, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ মনে করেন, সম্প্রতি বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। বজ্রপাতের ঘটনা খোলা জায়গায় বেশি দেখা যায়। আগে কৃষিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। এখন মাঠে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে গেছে। ফলে মাঠে কাজ করা মানুষ আক্রান্ত হয় বেশি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগাভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১১০ ভোল্ট বিদ্যুৎ যথেষ্ট। সাধারণত আমরা বাসাবাড়িতে মাত্র ২২০ ভোল্ট ও শিল্প-কারখানায় ১২শ’ ভোল্টের বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।

সার্ক আবহাওয়া গবেষণাকেন্দ্রের (এসএমআরসি) তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪০টি বজ্রপাত হয়। এতে বছরে মাত্র ১৫০ বা তার কিছু বেশি লোকের মাধ্যমে খবর গণমাধ্যমে ছাপা হয়। আসলে এ সংখ্যা ৫০০ থেকে ৮০০ হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় প্রতিবছর সারা বিশ্বে বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার এক-চতুর্থাংশ ঘটে বাংলাদেশে।

পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, স্বাভাবিক বায়ুতে ৭৮ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ নাইট্রোজেন, ২০ দশমিক ৯৫ ভাগ অক্সিজেন, দশমিক ৯৩ ভাগ আর্গন ও দশমিক শূন্য ৩৯ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড এবং সালফারসহ সামান্য পরিমাণ অন্যান্য গ্যাস থাকে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে ৬৪-১৪৩ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাই অক্সাইড বিদ্যমান। আর প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড রয়েছে ২৫-৩২ মাইক্রোগ্রাম। যা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। এদিকে, মে-জুন মাস কালবৈশাখী ঝড়ের মওসুম হলেও বড় কোনো ঝড় বা বৃষ্টিপাত ছাড়াই সামান্য ঝড়ো বাতাসের সঙ্গেই ঘটছে বজ্রপাতের ঘটনা। আর এতে করে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফার গোত্রের গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি দায়ী ঝড়ো বাতাসের প্রভাবে দ্রুতগতির কালো মেঘের মধ্যে ঘর্ষণ ও সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হওয়া ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোঃ আবদুল মতিন এক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বজ্রপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কার্বন, নাইট্রোজেন ও সালফার গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে বজ্রপাতের পরিমাণও ততটা বাড়তে থাকবে। আর ভূমিতে বজ্রপাত ঘটার পেছনে অপরিকল্পিত মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ারও দায়ী।

আবদুল মতিন বলেন, মোবাইল টাওয়ারগুলো উচ্চতার কারণে বজ্রপাতের প্রথম শিকার হওয়ার কথা। কিন্তু আর্থ কানেকশন (ভূ-সংযোগ) ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এবং বজ্রপাতের বিদ্যুতের প্রবাহকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বা প্রযুক্তি এ সব টাওয়ারে রয়েছে। একই সঙ্গে এ সব টাওয়ার অত্যধিক ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড (তড়িৎ চৌম্বকক্ষেত্র) সৃষ্টি করায় বজ্রপাতে তৈরি হওয়া ইলেকট্রনও টাওয়ারগুলোর দিকে আকৃষ্ট হয়। আর উচ্চপ্রযুক্তির কারণে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ এ সব টাওয়ার কিছুটা ভূ-সংযোগের মাধ্যমে কমিয়ে ফেলে বাকিটা অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। ফলে যত্রতত্র বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে।

ঢাবির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, প্রচার মাধ্যমে বা গণমাধ্যমে বজ্রাপাত নিয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আলোচনা কম হয়। এটাকে একটা দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করে বজ্রপাত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

এদিকে বজ্রপাতে শহরের মানুষের চাইতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামের মানুষ। শহরের লোহার ধাতব সরঞ্জামের ব্যবহার বেশী বিপরীতে গ্রামের মানুষ বেশীর ভাগই খোলা জায়গা কিংবা মাঠে কাজ করতে হয়। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, বিদ্যুতের ধর্মই হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু খুঁটিকে প্রথমে স্পর্শ করা। বজ্রপাতের ক্ষেত্রে তাইই হয়। তাই খোলা জায়গায় কিংবা মাঠে কাজ করার সময় এক দীর্ঘকার লোহার এঙ্গেল লাগানো থাকলে বজ্রপাতের ক্ষতি থেকে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। এছাড়া বজ্রপাতের সময় শুয়ে পড়া এবং বেদ্যুতিক খুঁটির নিচে না দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন এ বিশেষজ্ঞ।

এই সংবাদটি 955 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ