দুধ হজম হয় না? এর রহস্যটা সম্পূর্ণ জিনগত নয়

প্রকাশিত: ৩:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২৬

দুধ হজম হয় না? এর রহস্যটা সম্পূর্ণ জিনগত নয়

স্বাস্থ্য ডেস্ক: দুধ কিংবা দুধজাত খাবার হজম করতে পারা মানব বিবর্তনের ইতিহাসে অন্যতম এক কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়। জন্মলগ্নে সব স্তন্যপায়ী শিশুর শরীরেই মায়ের দুধ ভাঙার জন্য ল্যাকটেজ এনজাইম সক্রিয় থাকে। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবেই এই এনজাইমের উৎপাদন অনেকটাই কমে যায় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট বা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু হিসেবে পরিচিত। ফলে তারা কাঁচা দুধ পান করলে পেটে গ্যাস, ক্র্যাম্প কিংবা ডায়রিয়ার মতো নানা শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হন।

তবে বৈজ্ঞানিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণাই প্রচলিত ছিল যে, যেসব সমাজে প্রাচীনকাল থেকেই গবাদিপশু পালনের প্রচলন ছিল, সেখানকার মানুষ জিনগত মিউটেশনের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও দুধ হজম করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক ও আয়ারল্যান্ডের প্রায় ৯০ থেকে ৯৭ শতাংশ মানুষ জিনগতভাবে ল্যাকটোজ সহনশীল। প্রাচীনকালে খাদ্য সংকট বা খরার সময় পুষ্টি ও তরলের উৎস হিসেবে দুধ পান করা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এই জিনগত তত্ত্বের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম চিত্রও দেখতে পাওয়া যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে।

মধ্য এশিয়ার দেশ যেমন মঙ্গোলিয়া ও কাজাখস্তানে পশুপালন ও ডেইরি পণ্যের ওপর মানুষের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা রয়েছে। প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলে যে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগেই সেখানে ঘোড়ার দুধ পানের প্রচলন ছিল। অথচ বর্তমান সময়েও সেখানকার ঐতিহ্যবাহী পশুপালকদের মধ্যে ল্যাকটোজ সহনশীলতার হার মাত্র ১২ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রাচীন ডিএনএ গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্য এশিয়ার মানুষেরা জিনগতভাবে দুধ হজম করার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে অর্জন না করেই ডেইরি সংস্কৃতির সঙ্গে সফলভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

জিনগত রূপান্তরের পরিবর্তে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংস্কৃতির প্রয়োগ ঘটেছে। মধ্য এশিয়ায় সচরাচর কাঁচা বা তাজা দুধ পান করা হয় না, বরং গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘কিমিজ’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী পানীয় তৈরি করা হয়। ফারমেন্টেশনের এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর ল্যাকটোজ ভেঙে যায় এবং তা সহজেই হজমযোগ্য হয়ে ওঠে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও দই ও ঘি কিংবা বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ওপর নির্ভর করে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ প্রচুর ডেইরি খাদ্য গ্রহণ করে থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, মানবজাতি কেবল জৈবিক মিউটেশনের মাধ্যমেই প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়নি, বরং নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও সংস্কৃতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেও পরিবেশের সঙ্গে টিকে রয়েছে। ইউরোপের মানুষেরা যেখানে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সরাসরি দুধ হজম করার ক্ষমতা লাভ করেছে, সেখানে মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির বদৌলতেই ডেইরি সংস্কৃতিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।

এই সংবাদটি 3 বার পঠিত হয়েছে