সড়ক দূর্ঘটনার মহোৎসব : যাত্রী নিরাপত্তা কোথায়

প্রকাশিত: ৫:২৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০১৭

সড়ক দূর্ঘটনার মহোৎসব : যাত্রী নিরাপত্তা কোথায়

আব্দুল কাইয়ূম : আমাদের দেশে প্রতিদিনের পত্রিকার পাতার হেডলাইন হয়ে পরেছে সড়ক দূর্ঘটনা । প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়াগাতে সড়ক দূর্ঘটনা ঘটছেই । রাস্তাঘাটের বেহাল দশা , চালকের অদক্ষতা , যান্ত্রিক ত্রুটি , যাত্রী অসতর্কতা , দূরপাল্লায়া গাড়ি চালানো ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে থাকে । যার কারণে জন জীবন আজ হুমকির সম্মুখীন হয়ে পরেছে । সড়ক দূর্ঘটনায় যেমন বাড়ছে অকাল মৃত্যুর সংখ্যা , তেমনি বাড়ছে পঙ্গুত্বের সংখ্যা ।

 

এ বছরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি দূর্ঘটনার প্রতিবেদন : ৩ মে ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্তের প্রতিবেদনে জানা যায় ” চলতি বছরের গত চার মাসে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ১৫৫২ আহত ৩৮৩২ জন ” ২৯ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রতিবেদনে জানা যায় ” রাজধানীসহ সারাদেশে কয়েকদিনে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ৪৩ আহত ৬১ ” ৫ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্তের প্রতিবেদনে জানা যায় ” ঈদে সড়ক রেল ও নৌপথে ২৪০টি দূর্ঘটনায় ৩১১ নিহত আহত ৮৬২ জন ” উল্লেখ্য এর মধ্যে ২০৫ টি সড়ক দূর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত ও ৮৪৮ জন আহত।

 

১ জুলাই একটি পরিসংখ্যানে জানা যায় চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে জুন অর্থাৎ ৬ মাসে সড়ক দূর্ঘটনা হয়েছে ১৯৮৩ টি নিহত ২২৯৭ এবং আহত ৫৪৮০ জন। এছাড়া হয়ত আরও অনেক সড়ক দূর্ঘটনা ঘটেছে যা গণমাধ্যমে আসে নি বা যাত্রী কল্যাণ সমিতি এর হিসাব পায় নি।

 

সড়ক দূর্ঘটনার এই মহোৎসবে যাত্রী নিরাপত্তাইবা কতটুকু আজ চিন্তার বিষয় । বাস্তবিক আমি আমার নিজের কথাই যদি বলি আমি যতটুকু পারি আমার নিজ মোটর বাইকে যাতায়াত করার চেষ্টা করি । কারণ বর্তমান চালকদের উপর খুব একটা ভরসা রাখতে পারি না । সড়ক দূর্ঘটনার বহু কারণ থাকলেও বিশেষজ্ঞরা তিনটি কারণ বলেছেন। ১. চালকের গাফিলতি , ২. ভাঙ্গাচুরা রাস্তা , ৩. ফিটনেসহীন গাড়ি । এই তিনটি কারণে অনেকাংশে সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে থাকে ।

 

১. চালকের গাফিলতি : বর্তমান সময়ে বড় গাড়ি বাস থেকে শুরু করে তিন চাকার গাড়িতে অদক্ষ চালকের সংখ্যাই বেশী । অভাবের তাড়নায় কোন কাজ না পেয়ে গাড়ি চালাচ্ছে অনেকেই। তাছাড়া কোনো ভাল প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে ১০০% এর ৭০% ড্রাইভার পাওয়া যাবে যাদের লাইসেন্স নেই। সম্প্রতি সরকার লাইসেন্স এর উপর কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও এসব আইন প্রশাসনিক ত্রুটি থাকায় সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হচ্ছে না । এছাড়াও চালকরা নিয়মতি গাড়ি চালানোর নিয়ম মেনে না চলায় দূর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।

 

২. ভাঙ্গাচুরা রাস্তা : সড়ক দূর্ঘটনার অন্যতম কারণ হল রাস্তাঘাটের বেহাল দশা । বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের জেলা মহাসড়কগুলোর ১০০% রাস্তার মধ্যে ৪০% রাস্তা ভাল আর ৬০% রাস্তা খারাপ ।যার কারনে দেশের সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

৩. ফিটনেসহীন গাড়ি : ফিটনেসহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালক গাড়ির ফিটনেস ও দক্ষ চালক তৈরিতে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের অভাব রয়েছে। দেশে চালকের লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ। এর মধ্যে পেশাদার চালকের লাইসেন্স প্রায় আট লাখ। বাকিরা অপেশাদার । এ ছাড়া দেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ এর মধ্যে এক লাখ ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা- অটোটেম্পো চলাচল করছে ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৪১ হাজার। এমন বাস-মিনিবাস রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। বাকিগুলো অন্যান্য যানবাহন।

 

বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল এবং এগুলোর ফিটনেস সনদ নিতে হয় না। আর কিছু যানবাহন অকেজো হয়ে গেছে।অবশ্য ফিটনেস সনদ থাকা না-থাকা প্রায় সমানই । বাস- ট্রাকের যেগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, এগুলোর বেশির ভাগই বিআরটিএ কার্যালয়ে না গিয়েই সনদ নিয়ে থাকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন একদিকে যেমন সড়ক নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তেমনি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

 

আমাদের দেশে সড়ক দূর্ঘটনা এমন মহামারী রূপ ধারণ করেছে যে, বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (এআরসি) গবেষণা অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আহত হয় ৩৫ হাজার। অন্য দিকে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতি দশ হাজার যানবাহনে মৃত্যুর হার ৮৫ দশমিক ৬।

 

সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করার জন্য সরকারের অতি তাড়াতাড়ি কার্যকরী ব্যবস্হা গ্রহণ করা দরকার । চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৫০ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখে জনগত আশান্বিত যে যাতায়াত ব্যবস্হা উন্নত হলে দূর্ঘটনা কমবে । এই আশা তখনি সফল হবে যখন বাজেটের পুরো টাকা বরাদ্দকৃত খাতে যথাযথ ব্যবহার হয়ে থাকে ।

 

বিশ্বের যেকটি দেশে বড় বাজেট নিয়ে কাজ করা হয় এর মধ্যে বাংলাদেশ একটি । বাজেটের পুরো টাকা কাজের মধ্যে ব্যবহার হয়না ( রাঘব বোয়ালরা আত্মসাৎ করে ফেলে ) বলে উন্নত কাজও হয় না এট জনগন তথা দেশবাসীর অভিযোগ ।

 

প্রস্তাবিত বাজেটের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১৯ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা , রেলপথ বিভাগে ১৬ হাজার ১৩ কোটি টাকা , নৌ- পরিবহনে বিভাগে ২ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা বেসামরিক বিমান পরিবহন বিভাগে ৬৮৪ কোটি টাকা , ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে ২ হাজার ৫২২ কোটি টাকা এবং সেতু বিভাগে ৮ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ।

 

পরিবহন ও যোগাযোগ বিভাগের সড়ক বিভাগ , রেল বিভাগ , নৌ বিভাগ ও সেতু বিভাগ সড়ক দূর্ঘটনা রূধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। সড়কের বেহাল দশা দূর করে উন্নত সড়ক পথ তৈরী করা । তাছাড়া আমাদের দেশের রেলপথ যদি আরও উন্নত করা হয় তবে জনগন দূর পথে যাতায়াতে রেলপথ বেছে নেবে । বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষ রেলপথে যাতায়াত করতে চায় না রেলপথের বিভিন্ন অনিয়মের জন্য । এতে সরকার যদি বরাদ্দকৃত অর্থের সম্পূর্ণ রেলপথে ব্যয়ের সুষ্টু তদারকি রেখে রেলপথ উন্নত করেন তবে জগসাধারন রেলপথে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবে ।

 

সড়কপথে ফিটনেসহীন গাড়ি না চলা ও ট্রাফিক আইন মানার জন্য ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্বের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। বর্তমানে দেখা যায় যে ট্রাফিক পুলিশের অনেক ত্রুটি রয়েছে এর কারণে অনেকাংশে দূর্ঘটনা ঘটছে । তাই ট্রাফিক পুলিশকে এক্ষেত্রে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে । সর্বোপরি , জনসাধারণের সচেতনা ।

এই সংবাদটি 827 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ