শুরু হচ্ছে যৌথবাহিনীর তল্লাশি

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০১৬

শুরু হচ্ছে যৌথবাহিনীর তল্লাশি
নাছির উদ্দিন শোয়েব : আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক ধসের মাঝে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রাজধানী ঢাকায় এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার। মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তি বা যানবাহন তল্লাশি থেকে বাদ যাচ্ছে না। সূত্রমতে, আরো কঠোর অবস্থানে গিয়ে শিগগিরই যৌথবাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এমনকি মন্ত্রী-এমপিও তল্লাশি থেকে বাদ যাবে না বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

গুলশান ও শোলাকিয়ায় এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি ভয়াবহ হামলার পর ভাবিয়ে তুলছে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কমকর্তাদের। এবার ঈদ উদযাপনেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব ঘটনার প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই এখন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। বড় ধরনের জমায়েত হয় এমন স্থান, বিনোদন স্পট, অভিজাত শপিং মল বা সিনেমা হলেও যেতে চিন্তা করছেন। পরিবার পরিবাজন নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, মসজিদ, মন্দির, মঠসহ উপাসনালয়ে যেতেও ভয় পাচ্ছেন স্ব-স্ব ধর্মাবলম্বীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকরা আছেন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে। গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় সর্বকালের সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদেশি নাগরীকদের কর্মস্থান ও তাদের চলাফেরার পুরোটাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে। ফের কোনো বড়ধরনের হামলা এড়াতে সরকার এসব ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে কারো কারো মনে ভিড় করছে নানা শংকা। তবে তাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন ডিএমপি কমিশনার। আর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিশ্বব্যাপী দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করেই যাবে। দেশীয় গোয়েন্দা সংস্তা ইতোমধ্যে সরকারের কাছে রিপোর্ট দিয়েছে দেশে আরো হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, হিজবুত তাহরীরসহ দেশের নিষিদ্ধ ৭টি জঙ্গী সংগঠনের একসঙ্গে এত মানুষকে হত্যার ইতিহাস কারোরই নেই। তবে সেই ঘটনাই ঘটলো গুলশানে। যার দায় স্বীকার করে ওই নৃশংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণও সামাজিক মাধ্যমে হাজির করে ইসলামিক স্টেট বা আইএস।

এর ঠিক ছয় দিনের মাথায় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত শুরু হওয়ার আগেই ময়দানের পাশে পুলিশের ওপর হামলা চালায় কয়েকজন দুর্বৃত্ত। প্রকাশ্যে চলে গোলাগুলীও। পুলিশ বলছে, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার সূত্র একই। গুলশান ও শোলাকিয়ায় গোয়েন্দা পুলিশের একজন এসি, বনানী থানার ওসি ও দুই পুলিশসদস্যসহ মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ জনে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী দেশে অবস্থিত দূতাবাস ও কূটনৈতিব জোন ছাড়াও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জাতীয় সংসদ ভবন, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদের স্পিকারের বাসভবন, মন্ত্রীদের বাসভবন, ঢাকার বিদেশি দূতাবাস, পাঁচতারকা সব হোটেল, বেসরকারি কয়েকটি টেলিভিশন, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ভবন, সচিবালয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, ট্রেন, পুলিশের থানা, ফাঁড়ি, ঢাকার বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের বাসভবনসহ রাষ্ট্রীয় সব স্থাপনায় জঙ্গি হামলার আশঙ্কা রয়েছে। যে কারণে এসব স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এসব স্থাপনার প্রবেশমুখেই স্থাপন করা হয়েছে তল্লাশি চৌকি। বিমানবন্দরে যাত্রী ছাড়া দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এদিকে গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলায় ২৮ জনের মৃত্যুর আগেই বিদেশী বিভিন্ন রাষ্ট্রের সতর্ক বার্তা দিয়েছিল। ফলে আগে থেকেই গুলশানে বাড়ানো হয় চেকপোস্ট, তল্লাশি কার্যক্রম, কূটনৈতিক এলাকায় অনেক রাস্তায় নিরাপত্তার স্বার্থে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। স্থাপন করা হয় আইপি ক্যামেরা। বসানো হয় বিভিন্ন স্থানে ই-স্ক্যানার। এ সবকিছু ভেদ করে এমন রক্তাক্ত হামলার ঘটনায় নানা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। সবার প্রশ্ন, এত নিরাপত্তার মধ্যে হামলাকারীরা অস্ত্র ও বোমা নিয়ে কীভাবে প্রবেশ করল কূটনৈতিক এলাকায়? এ ঘটনার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথাও বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের পেশাদারিত্ব, দায়িত্বপালন ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এত নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে অস্ত্র নিয়ে জঙ্গি সন্ত্রাসীদের ভেতরে প্রবেশ সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। আর এতে কারও গাফিলতি আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, গুলশান তথা কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ নির্দেশনা রয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর ওপর। যদি কারও কোনো গাফিলতির তথ্য পাওয়া যায় অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এখন অনেকেরই প্রশ্ন, এত নিরাপত্তার মধ্যে গুলশানের নারকীয় হামলা ঠেকাতে না পারা আবারো এমন হামলার আতংক কি তাড়া করবে না রাজধানীবাসীকে? যদিও পুরো নিশ্চিন্ত হয়ে রাজধানীবাসীকে কাজে যোগ দেয়ার আশ্বাস ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের। পরামর্শ দেন নিজের সন্তান কিংবা আশপাশের কারো সন্দেহভাজন কার্যক্রম দেখলেই পুলিশকে জানানোর। জঙ্গীরা এই সমাজেই তৈরি হয়েছে।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনার কাজ চলছে। নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বসানো হবে আধুনিক সব নিরাপত্তা সরঞ্জাম। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ সন্দেহভাজন জঙ্গি ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা ও এর বিচার প্রক্রিয়ার হালনাগাদ বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করবে একটি বিশেষ নিরাপত্তা কমিটি। এই কমিটিতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি ছাড়াও এসবি, সিটিএসবি ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন করে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।

সূত্র জানায়, আগামী সপ্তাহ খানেকের মধ্যে রাজধানীর চেকপোস্টগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএন, এসপিবিএন ও আনসারের চৌকস সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। এদেরকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। এসব চেকপোস্টে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক শনাক্ত করতে মেটাল ডিটেক্টর ছাড়াও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বসানো হবে। থাকবে উচ্চ প্রযুক্তির কম্পিউটারাইজড ভেহিক্যাল মিরর ও বডি স্ক্যানার। এতদিন হলুদ প্লেটে নম্বরযুক্ত কূটনীতিক এবং বিভিন্ন দাতা ও সাহায্য সংস্থার গাড়ি তল্লাশি করা না হলেও এখন থেকে করা হবে। কেননা জঙ্গি সন্ত্রাসীরা হলুদ প্লেটে ভুয়া নম্বর ব্যবহার করে অস্ত্র-বিস্ফোরক বহন করার ঝুঁকি নিতে পারে। গুলশান হামলায় প্রাথমিকভাবে এ রকম প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে মন্ত্রী-এমপিসহ সব পর্যায়ের ভিআইপিদের যানবাহনও বিশেষ ব্যবস্থায় তল্লাশি করা হবে।

এই সংবাদটি 841 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ