বিয়ানীবাজারে দুই গ্রামের মধ্যে রাতভর দফায় দফায় সংঘর্ষ, গুলাগুলি: অাহত ২৫, ফের সংঘর্ষের আশংকা

প্রকাশিত: ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০১৬

বিয়ানীবাজারে দুই গ্রামের মধ্যে রাতভর দফায় দফায় সংঘর্ষ, গুলাগুলি: অাহত ২৫, ফের সংঘর্ষের আশংকা
মুকিত মুহাম্মদ, বিয়ানীবাজারঃ
বিয়ানীবাজার উপজেলার মুল্লাপুর ইউনিয়নের পাতন ও কাছাটুল গ্রামবাসীর মধ্যে রাতভর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার দিবাগত রাতে উভয়পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে দাওয়া পাল্টা দাওয়া, দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পরাজিত প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম সহ উভয় পক্ষে প্রায় ২০ জন আহত হওয়ার খরব পাওয়া গেছে। গুরুতর আহত কাছাটুল গ্রামের প্রবাসী শরীফ নামের যুবককে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। অন্যান্যদের বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে আশরাফুল ইসলাম সহ ৬জনকে আসামী করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শেষ খরব পাওয়া পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৪টা থেকে স্থানীয় গোডাউন বাজারে পাতন গ্রামবাসীর বৈঠক চলছে। এদিকে কাছাটুল গ্রামেও গ্রামবাসীর বৈঠক চলছে। উভয়পক্ষই ফের সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। তাই যেকোন সময় উভয় গ্রামবাসীর মধ্যে বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আংশকা রয়েছে। বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত সংখ্যক নয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে পাতন গ্রামের আং নুর কটইর ছেলে জাহেদ আহমদ স্থানীয় লামা পাতন পয়েন্টের একটি দোকানে গিয়ে ক্যারেম খেলতে থাকা কয়েকজন যুবককে উদ্দেশ্য করে এখানে শরীফ কে বলে জানতে চায়। এ সময় কাছাটুল গ্রামের রিনা মিয়ার পুত্র মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শরীফ উদ্দিন স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে শরীফ বলে পরিচয় দেয়। মুহুর্তের মধ্যেই জাহেদ সাথে থাকা ধারালো দা দিয়ে শরীফকে উপর্যপুরি কয়েকটি কোপ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। এসময় হাত দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে গেলে শরীফের হাতের ৪টি আগুল কেটে পৃথক হয়ে পড়ে ও শরীরের একাধিক স্থান জখমপ্রাপ্ত হয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করে। তার অবস্থা গুরুত্ব হওয়ায় তাৎক্ষণিক ভাবে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে নিরোপরাধ প্রবাসী যুবক শরীফকে দা দিয়ে কোপানোর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কাছাটুল গ্রামবাসী উত্তেজিত হয়ে উঠে। এ সময় কাছাটুল গ্রামের উত্তেজিত জনতা পাতন গ্রামের ভিতর ঢুকে আক্রমণকারী জাহেদের বাড়িতে আক্রমন করে। প্রাণের ভয়ে জাহেদ ও তার বাড়ীর লোকজন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ নিয়ে উভয় গ্রামবাসীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উভয় গ্রামবাসী সংঘটিত হতে থাকে। এক পর্যায় রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে পাতন গ্রামের নবনির্বাচিত মেম্বার ওলিউর রহমান ওলি, সিদ্দিক আহমদ, আব্দুল করিম সহ কয়েকজন কাছাটুল গ্রামে গিয়ে মুল্লাপুর ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আব্দুল মন্নান, কাছাটুলের স্থানীয় মেম্বারসহ মুরব্বিয়ানদের সাথে কথা বলে বিষয়টি আপোষ মীমাংসার প্রস্তাব দেন। আপোষে পাতন গ্রামের বিবাদিসহ বাকীদের মতামত আছে কিনা জানতে চান কাছাটুলের মুরব্বিরা। এসময় পাতন গ্রামের সালিশ প্রস্তাবকারীরা বিবাদীসহ নিজেদের গ্রামের ঐক্যমতের বিষয়টি জানতে ১ ঘন্টার সময় নিয়ে ফিরে আসেন। এতে সংর্ঘের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়া থানা পুলিশও ফিরে আসে। সালিশের উদ্যোগতারা তাৎক্ষণিক ভাবে গ্রামের অন্যদের সাথে যোগাযোগ করে পাতন গ্রামের স্থানীয় শরফ মিয়ার বাড়িতে বৈঠকে বসেন।
এদিকে পাতন গ্রামের উচ্ছৃঙ্খল কিছু যুবক লামাপাতনস্থ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাছাটুলবাসীকে উদ্দেশ্য করে হাকঁডাক দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কাছাটুল গ্রামবাসী ঐ যুবকদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে পাতন গ্রামের যুবকরা পালিয়ে দৌড়ে এসে বৈঠকরত শরফ মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। উত্তেজিত কাছাটুলবাসী এসময় ঐ বাড়িতে আক্রমন চালায়। এসময় আশরাফুল ইসলামসহ ঐ বাড়িতে জমায়েতরাও গ্রামবাসীর পক্ষ নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আশরাফুল ইসলাম বন্দুক দিয়ে দেদারছে গুলি ছুড়লে প্রতিপক্ষের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। তবে এক পর্যায় আশরাফুল ইসলামের হাতে প্রতিপক্ষ ধারালো দা দিয়ে কোপ দিলে তিনি মারাত্ব জখমপ্র্তা হন বলে জানা গেছে। এসময় সংঘর্ষ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ পূণরায় ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষে প্রায় ১৯ জন আহত হওয়ার খরব পাওয়া গেছে। আহতরা হলেন, কাছাটুল গ্রামের রিনা মিয়ার পুত্র শরিফ উদ্দিন, একই গ্রামের বাবুল (৩০), জাকির (১৮), আজিম (৩৫), শাহাজান (১৯), কাশেম (৩০), হবিব আলী (১৮), ইসমাইল (২০), কামেল (১৮), কাজল (২৫), ময়নুল (২০), আলী হোসেন (৩২), আছকন আলী (৫৫), মুল্লাপুর গ্রামের অধিবাসী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জামিল আহমদ, পাতন গ্রামের আশরাফুল ইসলাম প্রমুখ।
তবে ফের সংঘর্ষের বিষয়ে পাতন গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সালিশ উদ্যোগতারা ১ ঘন্টা সময় নিয়ে ফিরে এসে নিজেদের গ্রামের শরফ উদ্দিনের বাড়িতে বসে যখন মিটিং করছিলেন, তখন নির্ধারিত সময়ের ৩০মিনিটও অতিবাহিত হয় নাই। অথচ এ সময় কাছাটুল গ্রামবাসী অত্রর্কিত ভাবে এসে সালিশকারীদের উপর অন্যায় ও জঘন্যভাবে আক্রমণ চালায়। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে যোগাযোগ করলে কাছটুল গ্রামের পক্ষের মুরব্বিরাও আর ফোন ধরেননি।
এ ঘটনায় কাছাটুল গ্রামের আব্দুল গফুর বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে। মামলায় আশরাফুল ইসলাম ও তার দুই পুত্র নাবিল, নাদিম এবং আং নুর কটই মিয়ার তিন পুত্র জাহেদ, মুর্শেদ ও রাশেদ কে আসামী করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। দু’গ্রাম সহ পাশ্ববর্তী এলাকা জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উভয় গ্রামবাসী আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ সহ নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে বলে সূত্রে জানা গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৪টায় স্থানীয় গোডাউন বাজারে বৈঠকে বসেছে পাতন গ্রামবাসী। অপর দিকে কাছাটুল গ্রামবাসীও নিজেদের মধ্যে বৈঠক করছে। আজ বাদ জোহর কাছাটুল ও মাটিকাটা গ্রামবাসীর যৌথ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। উভয় পক্ষই মারমুখি অবস্থান নিচ্ছে। তাই দু’পক্ষের মধ্যে যেকোন সময় বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংর্ঘের আশংকা বিরাজ করেছ। ফের সংঘর্ষ বাঁধলে বর্তমান মোতায়েনকৃত পুলিশ দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর হয়ে উঠবে। তাই অতিরিক্তি পুলিশ মোতায়েন করা জরুরী বলে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত।

এই সংবাদটি 660 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ