বিধবা জহিরন বাইসাইকেল চালিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আনন্দিত

প্রকাশিত: ১:৩৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০১৭

রাজশাহী বিভাগীয় চীফ :
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম তালুক দুলালী’র মৃত সায়েদ আলীর স্ত্রী জহিরন বেওয়া (৯০)। মহান মুক্তিযুদ্ধের চার বছর আগে স্বামীর মৃতুতে ভেঙ্গে পড়া সংগ্রামী নারী ৩ ছেলে আর ২ মেয়েকে নিয়ে সংসার সংগ্রামী হয়ে উঠেন। বিধবা জহিরন বাইসাইকেল চালিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে নিজেকে আনন্দিত মনে করছেন কিন্তু মনের উদ্যমতায় এবয়সেও বাইসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরে অসুস্থ্য দরিদ্র মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন জহিরন বেওয়া। এতে যেমন অসহায় গরীব মানুষগুলো অল্প টাকায় ভাল সেবা পেয়ে খুশি, তেমনি জহিরন বেওয়া নিজেকেই আনন্দিত মনে করছেন।
জানা যায়, দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু সংসারে অভাব-অনটন ছিল প্রতিক্ষনের চিন্তা। সমাজের কথা উপেক্ষা করে ১৯৭৩ সালে জহিরন পরিবার পরিবল্পনার অধিন স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে দীর্ঘ ৪ মাসের প্রশিক্ষন গ্রহন করে চুক্তি ভিত্তিক মাসিক মজুরীতে কর্মে যোগ দেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতেন। ২শ তেকে ৩শ অবশেষে ৫শ টাকা মাসিক মজুরী পেয়ে ১০বছর চাকুরী করে অবসের যান জহিরন কিন্তু বাড়িতে বসে থাকতে পারেননি। চাকুরী বাদ দিয়েছেন কিন্তু অর্জিত অভিজ্ঞতা বাদ দেননি । তাই বাড়িতে বসে না থেকে আবারো গ্রামবাসীর স্বাস্থ্যসেবায় মনোযোগী জহিরন এখনো কাজ করছেন হাসি মাখা মুখে।
জহিরন বেওয়া বলেন, আমি শুধু সাধারন রোগ যেমন, জ্বর, মাথা ব্যথা, বমি ,শারিরীক দুর্বলতাসহ অন্যন্যা রোগের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। চিকিৎসার জন্য আমাকে কোন অর্থ দিতে হয় না, তবে আমি বাজার মুল্যে তাদের কাছে ঔষধ বিক্রি করি এতে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ টাকা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে কোন রকম।
তিনি আরও বলেন, জেলার আদিতমারী উপজেলার ৩০টি গ্রামে প্রায় দুই হাজারের বেশী পরিবারের সাথে রয়েছে আমার যোগাযোগ। আমি প্রতিদিন বাইসাইকেল চালিয়ে কমপক্ষে ৭টি গ্রামের ৭০টি বাড়িতে অবস্থান করি এবং তাদের খোঁজ খবর নিই, এভাবে প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করার ফলে তিনি গত ৫০ বছরে কোন রোগে আক্রান্ত হননি।
হামিদুল ইসলাম (৭৫) নামে একজন জানান, গত ৪৪ বছর ধরে জহিরন বেওয়াকে দেখছি বাইসাইকেল চালিযে গ্রামে গ্রামে ঘুড়ে গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। সাধারন কোর অসুখ-বিসুখ হলে আমরা তার কাছেই চিকিৎসা সেবা নিই আর তিনি কখনোই আমাদের কাছে টাকা নেননি। মাঝে-মধ্যে ঔষধও বিনামুল্যে দিয়ে দেন, জহিরন বেওয়া গ্রামের গরীব মানুষের ডাক্তার। অনেক গরীব মানুষ তার কাছে বিনামুল্যে ঔষধ নিয়ে থাকেন। আর বড় ধরনের অসুখ বিসুখ হলে তিনি আমাদের হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন এমনকি নিজেই হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন।
জহিরন বেওয়ার ছোট ছেলে তোরাব আলী (৫৯) জানালেন, তিনি বার বার চেষ্টা করে যাচ্ছেন মাকে বাইসাইকেল চালিয়ে বাইরে যেতে না দিতে কিন্তু সফল হচ্ছেন না। আমাদের সামান্য কিছু আবাদি জমি আছে তা দিয়ে সংসার ভালোই চলে, কোন অভাব নেই সংসারে, জানালো তোরাব আলী। মা আমাকে বলেন প্রত্যেক মানুষকে সমাজের জন্য ভালো কিচু করতে হয়, করা উচিৎ। আমি যেটা করছি সেটা শুধু কাজ নয়, এটি সমাজের কল্যাণকর আর আমি এটি মৃত্যুর আগ পযর্ন্ত করে যাবে।
সংগ্রামী নারী জহিরন বেওয়ার স্বপ্ন, গ্রামের মানুষের পাশে থেকে তাদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাবেন আর শরীরে যতদিন বল থাকবে ততোদিন বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুড়ে বেড়াবেন।

এই সংবাদটি 478 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ