বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবক ‘জঙ্গি’ শরিফুল নয় সাতক্ষীরার কলেজ ছাত্র মুকুল!

প্রকাশিত: ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ২১, ২০১৬

স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া বাঁশপট্টি এলাকায় শনিবার রাতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এক যুবক নিহত হন। পুলিশ নিহতকে ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার প্রধান শরিফুল ওরফে হাদি বলে দাবি করে। তবে নিহতের স্বজনেরা জানিয়েছে, তার নাম শরিফুল ওরফে হাদি নয়। সে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মুকুল রানা। তার জাতীয় পরিচয়পত্রেও মুকুল রানা নাম উল্লেখ আছে।
গতকাল সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে মুকুলের লাশ শনাক্ত করে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে এ দাবি করেন তার দুলাভাই হেদায়েতুল ইসলাম ও চাচাত ভাই রহমত আলী। নিহতের বাবা আবুল কালাম আজাদের দাবি, তার ছেলের নাম মুকুল রানা। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিল। এ ব্যাপারে তখন থানায় জিডি করা হয়। আবুল কালাম আজাদের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে তার সন্তান কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কিনা বলতে পারেন না। মুকুল রানারা তিন ভাইবোন। তার বাবা বলছেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুকুল সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে যশোরে বসুন্দিয়া এলাকায় শ্বশুর বাড়ির কাছ থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তাকে কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল সে। গতকাল টিভিতে খবর দেখে তিনি ছেলের ব্যাপারে জানতে পারেন।
নিহত তরুণের সুরতহাল রিপোর্ট করা হয় রোববার বিকালে। খিলগাঁও থানার এসআই আল মামুন রিপোর্টে নিহতের নাম শরিফুল উল্লেখ করেন। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা অভিভাবক ছাড়া এ নামে লাশের সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইলিয়াস মেহেদী। ফলে অজ্ঞাতনামা (২৫) হিসাবে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে লাশ ঢামেকের মর্গে রাখা হয়। নিহতের দুলাভাই পরিচয় দিয়ে সাতক্ষীরা নিবাসী হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, নিহতের নাম শরিফুল নয়, মুকুল রানা। এ সময় তিনি মুকুলের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখান। যার নম্বর, ১৯৯৩৮৭১৮২৫৪০০০০৬৮। এতে মুকুলের পিতার নাম মো. আবুল কালাম আজাদ এবং মাতার নাম মোছা. ছকিনা লেখা হয়েছে। তার জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৯৩ সালের ২৫ নভেম্বর।
হেদায়েতুল বলেন, পত্রিকায় নিহত মুকুলের ছবি দেখে তারা সাতক্ষীরা থেকে ঢামেক হাসপাতালে এসেছেন। লাশ দেখে মুকুলকে চিনতে পেরেছেন। তিনি আরও জানান, মুকুল সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিল। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিল সে। সাতক্ষীরায় মুকুলের বাবার ছোট চিংড়ি ঘেরের ব্যবসা রয়েছে। আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না হওয়ায় এক বছর আগে সে ঢাকায় চলে আসে। তবে মুকুল ঢাকার উত্তরায় কোথায় থাকতো, কী করতো বা কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কি না তা তিনি জানেন না বলে হেদায়েতুল সাংবাদিকদের জানান।
মুকুল রানার বাবা আবুল কালাম আজাদের দাবি, মুকুল রানা চার মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন। তিনি চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি যশোরের জগন্নাথপুরে বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রীর নাম মৌহা আক্তার  রিমি। বিয়ের পরে একবার সাতক্ষীরায় বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর আবার যশোরে শ্বশুরবাড়িতে যান। ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় যশোরের বসুন্দিয়া এলাকা থেকে তাকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনার তিন চার দিন পর যশোর কোতোয়ালি থানায় মুকুল রানার শালা আমির হোসেন একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
আবুল কালাম আজাদের দাবি, স্কুল-কলেজের সনদে তার ছেলের নাম মুকুল রানা। স্থানীয় লোকজনও তাকে মুকুল রানা নামে চেনেন। তার বয়স ২৩ বছর। তিনি সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। দুই বছর ধরে পড়াশোনা বাদ দিয়েছেন। আবুল কালাম আজাদ বলেন, তার দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। সেই পক্ষে মাসুদ রানা নামের এক ছেলে আছে। তিনি চিংড়ি ঘেরে কাজ করেন। দ্বিতীয় বউয়ের এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে বড়, মুকুল রানা। মেয়ের নাম শারমীন সুলতানা রিমি। রিমি সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক শ্রেণির ইসলামের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আবুল কালাম আজাদের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। নিহত শরিফুলের বোন রিমির দাবি, তার ভাই মুকুল খুব মেধাবী ছিলেন। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, গত রোববার পুলিশ জানিয়েছিল, রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া বাঁশপট্টি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে হাদি নিহত হয়েছে। সে সংগঠনটির সিøপার সেলের অন্যতম কিলার। পুলিশের ভাষ্য, নিহত যুবক লেখক ও ব্লগার ড. অভিজিৎ রায় হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়। তাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. দিদার আহাম্মদ দাবি করেন, ‘নিহত শরিফুল বিভিন্ন নামে গোপনে সক্রিয় ছিল। অভিজিৎসহ আরও ছয়টি খুনে সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিল সে।’ তিনি আরও বলেন, অভিজিৎ হত্যাকা-ের তদন্তে সংগ্রহ করা সিসি টিভি ফুটেজে তাকে দেখা গেছে। বিভিন্ন সময় ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজন যে ছয় জঙ্গি সদস্যকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ সম্প্রতি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল তাদের মধ্যে শরিফুল দ্বিতীয়।

এই সংবাদটি 904 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ