প্রবল আকার ধারণ করেছে ইয়াস

প্রকাশিত: ৯:৩১ পূর্বাহ্ণ, মে ২৬, ২০২১

প্রবল আকার ধারণ করেছে ইয়াস

শক্তি আরও বাড়িয়েছে ইয়াস, এটি রূপ নিয়েছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে। তবে গতিপথ আগের মতোই রয়েছে ভারতের ওড়িষা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে।

মহামারীর মধ্যে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে শুধু ওড়িষা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সতর্কতামূলক পদক্ষেপে ট্রেন-বিমান চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়টির গতিমুখ বাংলাদেশের দিকে না হলেও এর প্রভাব বলয়ে খুলনা উপকূল থাকছে বলে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার আশ্রয় কেন্দ্র।

বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দুর্ঘটনা এড়াতে নদীপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার দুপুর নাগাদ ওড়িষার প্যারাদ্বীপ এবং পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপের মাঝ দিয়ে উপকূলে আঘাত হানবে বলে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ পূর্বাভাস দিয়েছে।

তবে এর কেন্দ্র থাকবে ওড়িষার বালাশোর এলাকায়। আর কেন্দ্রের বহিরাংশ সকালেই উপকূলে আঘাত হানতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এর গতিপথ ও প্রভাব বলয়। সূত্র: ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এর গতিপথ ও প্রভাব বলয়। সূত্র: ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর।

ভারতের আবহাওয়া বিভাগের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবেই উপকূলে উঠে আসবে ইয়াস, তখন বাতাসের গতিবেগ থাকবে ১৫৫ থেকে ১৬৫ কিলোমিটার, যা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

মঙ্গলবার রাতে ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছিল। ছয় ঘণ্টা ধরে এই গতি থাকলেও তার আগে দুপুরে এর গতি ছিল ঘণ্টায় ১৭ কিলোমিটার।

মঙ্গলবার রাত ১২টায় ঝড়টি প্যারাদ্বীপ থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে ছিল। তখন সাগরদ্বীপ থেকে এর দূরত্ব ছিল ২১০ কিলোমিটার।

বাংলাদেশের মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে সন্ধ্যায় এটি ৩৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

পূর্ণিমার মধ্যে ঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ার হতে পারে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে।

ইয়াস: ভারি বর্ষণ ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস, ৩ নম্বর সংকেত

আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়াসহ অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। সেই সঙ্গে পূর্ণিমায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৬ ফুট বেশি উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হতে পারে উপকূলের নিচু এলাকাগুলো।

খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলা এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সঙ্গে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ বলেন, “ঘূর্ণিঝড়টি ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে যাচ্ছে। আমাদের থেকে দূরে। তবে এর প্রভাবে ঝড়ো হাওয়া ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোয়ারের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।”

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস: জলোচ্ছ্বাস আতঙ্কে উপকূলবাসী

ইয়াসের প্রভা‌বে ভোলায় নিম্নাঞ্চল প্লা‌বিত

ঝড় আসার আগেই ডুবেছে ভোলার নিম্নাঞ্চল।
ঝড় আসার আগেই ডুবেছে ভোলার নিম্নাঞ্চল।

উপকূলে প্রস্তুতি

সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস’র কারণে উপকূলীয় এলাকাসহ সারাদেশের ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এনডিআরসিসি, সিপিপি অধিশাখা এবং সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো খোলা থাকবে।

বুধবার সরকারি ছুটির দিনে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগে কন্ট্রোলরুম খোলার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মাঠ পর্যায়ের সব সরকারি কর্মকর্তাদের সার্বিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বিভিন্ন ঘাঁটিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সেল গঠনের পাশাপাশি সার্চ অ্যঅন্ড রেস্‌কিউ অপারেশন এবং মানবিক সহায়তা দিতে বিভিন্ন ধরনের বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রেখেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে এবারও প্রায় ১৫ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে ২৫ লাখ মানুষের ঠাঁই হবে।

ঝড়ের প্রস্তুতি: আশ্রয় কেন্দ্র এবারও আগের ৩ গুণ

নদীপথে যাত্রীবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ অভ‍্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এরইমধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলোর নদীর পানি ফুলে ওঠার খবর আসায় খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর এবং কুষ্টিয়া নদী বন্দরকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারী সংকেত এবং দেশের অন্যান্য নদী বন্দরকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এর মানে হল, বন্দর ও বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলো দুর্যোগ কবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং ঘূর্ণি বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার হতে পারে।

উত্তর বঙ্গোসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস: আবারও সুরক্ষা দেবে সুন্দরবন?

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ইয়াস চলছে ভারতের উড়িষ্যা-পশ্চিম বঙ্গ উপকূলের দিকে, এর প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত জারি রয়েছে। মঙ্গলবার চট্টগ্রামের আকাশও ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ছবি: সুমন বাবু
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ইয়াস চলছে ভারতের উড়িষ্যা-পশ্চিম বঙ্গ উপকূলের দিকে, এর প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত জারি রয়েছে। মঙ্গলবার চট্টগ্রামের আকাশও ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ছবি: সুমন বাবু

তাপপ্রবাহ কেটে গেছে

দেশজুড়ে টানা কয়েকদিনের তাপপ্রবাহের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টিতে মঙ্গলবার অধিকাংশ এলাকা থেকে কেটে গেছে তাপপ্রবাহ।

মঙ্গলবার পাবনা, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ ও ফেনী অঞ্চলসহ সিলেট বিভাগের উপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও তাও প্রশমিত হবে বলেন জানান আবহাওয়াবিদ খো. হাফিজুর রহমান।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় সিলেটে ৩৭.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে ঈশ্বরদীতে ৭০ মিলিমিটার; ঢাকায় ৩৭ মিলিমিটার।

পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বত্র বৃষ্টির আভাস রয়েছে।

উপকূলের মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরতে মাইকিং হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে। ছবি: রয়টার্স
উপকূলের মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরতে মাইকিং হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে। ছবি: রয়টার্স

ভারতে প্রস্তুতি

ওড়িষা ও পশ্চিমবঙ্গে মঙ্গলবার গাড়ি ও নৌকায় করে উপকূলের নিচু এলাকার বাসিন্দাদের স্কুল, সরকারি ভবন ও আশ্রয়কেন্দ্র বানানো বিভিন্ন স্থাপনায় সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।

গর্ভবতী নারী ও শিশুদের পাঠানো হচ্ছে সরকারি হাসপাতালে। জেলেরা তাদের নৌকাগুলোকে তুলে রাখছেন তীরে।

ঘূর্ণিঝড়টি যেখানে আছড়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার নিকটবর্তী উড়িষ্যার বালাশোর জেলায় স্বেচ্ছাসেবকদেরকে মেগাফোন ব্যবহার করে বাসিন্দাদের সতর্ক করতে ও সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।

“বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া সবসময়ই চ্যালেঞ্জের। সাধারণ সময়েও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে। আর এখন তো কোভিড,” বলেছেন বালাশোরের ত্রাণ কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ভিশাল কুমার দেব।

লঘুচাপ থেকে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশজুড়ে তাপদাহের মধ্যে শনিবার বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়, রাতে সুস্পষ্ট লঘুচাপে রূপ নেয় এটি।

রোববার বেলা ১২টার দিকে সুস্পষ্ট লঘুচাপটি নিম্নচাপে পরিণত হয়। মধ্যরাতে তা গভীর নিম্নচাপে রূপ নেয়।

সোমবার এটি আরও ঘনীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হল ‘ইয়াস’। মঙ্গলবার এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং সন্ধ্যায় অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাইক্লোন সংক্রান্ত আঞ্চলিক সংস্থা এসকাপের নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী এ ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘ইয়াস’; এটি ওমানের দেওয়া নাম।

চলতি মৌসুমে বঙ্গোসাগরে এটাই প্রথম শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, যেটি উপকূলে আঘাত হানতে যাচ্ছে।

বুধবার ঝড়টি উপকূল অতিক্রম করার পূর্বাভাস রয়েছে। উপকূল অতিক্রমকালে বৃষ্টি ঝরিয়ে তা ধীরে ধীরৈ দুর্বল হয়ে মিলিয়ে যাবে।

এই সংবাদটি 748 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ