পাবনায় গ্যাসের বাণিজ্যিক উত্তোলন নিয়ে সংশয়

প্রকাশিত: ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০১৭

পাবনায় গ্যাসের বাণিজ্যিক উত্তোলন নিয়ে সংশয়

রাজশাহী বিভাগীয় চীফ :

পাবনার মোবারকপুরে গ্যাসের সন্ধান মিললেও তার বাণিজ্যিক উত্তোলন নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। অনুসন্ধানের তিন বছরে সংশ্লিষ্টরা মোবারকপুরকে এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র দাবি করলেও ব্যবহার উপযোগী গ্যাস না থাকার খবরে চরম হতাশ এলাকাবাসী।
বাপেক্স সূত্র জানায়, আশির দশকে জার্মানির কোম্পানি জিজিএজি উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় অনুসন্ধানকালে পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মোবারকপুর গ্রামে গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনার কথা জানায়। পরে ২০০৬ সালে এখানে অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।
২০১০ সালে নতুন করে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কারিগরি কারণ দেখিয়ে মোবারকপুর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তরে পাগলাদহ মৌজায় নতুন করে কূপ খননের স্থান নির্ধারণ করা হয়। নানা জটিলতা পেরিয়ে খনন কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের আগস্টে। খননকাজ চলাকালে একই বছরের ডিসেম্বরে ৪ হাজার ১৭৫ মিটার গভীরতায় খনন পাইপ আটকে যায়। খননকাজে ত্রুটি ও গ্যাসের অতিরিক্ত ঊর্ধ্বমুখী চাপের কারণে দু’দফা কাজ বন্ধ রাখার পর ২০১৬ সালের নভেম্বরে নিজস্ব অর্থায়নে খনন শুরু করে বাপেক্স।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি এ কূপের ৪ হাজার ২২০ থেকে ৪ হাজার ২২৩ মিটার এবং ৪ হাজার ২৪০ থেকে ৪ হাজার ২৪৪ মিটার গভীরতার দুটি স্তরে গ্যাসের অস্তিত্ব মেলে। তবে, চাপ আশানুরুপ নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এতে চরম হতাশ স্থানীয়রা। এ ঘটনাকে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে এলাকাবাসী দুষছেন ত্রুটিপূর্ণ খনন ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলাকে।
মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্র এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে বাপেক্সের লোকজন এখানে প্রচুর গ্যাস আছে বলে দাবি করছিল। তারা বলত এখানে গ্যাসের চাপ এতই বেশি যে, তা উত্তোলনের যন্ত্রই নাকি বাপেক্সের নেই। বেশ কয়েকবার কাজও বন্ধ রাখলো, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাদি আনতে। এখন হঠাৎ তারা বলছে, এখানে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নেই। আমার ধারণা অদক্ষতার কারণে গ্যাসক্ষেত্র নষ্ট করে তারা এখন পালাতে চাইছে।’
একই এলাকার আব্দুর রশিদ বলেন, ‘গ্যাস ফিল্ডে কাম করার সময়, বাপেক্সের ইঞ্জিনিয়াররা মেশিনপাতি ফেলে দৌড়ে বাইরে আসত। তারা তখন বলেছিলেন গ্যাসের চাপে থাহাই মুশকিল। এতদিন ধরে কী দিয়ে কী করেছেন। এখন তারাই বলছেন গ্যাসই নেই। তাহলে, এতো গ্যাস গেলে কোথায়?’
খননকাজে ত্রুটির কথা স্বীকার করে মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত খনন কর্মকর্তা মো. শাহিদ উল্লাহ বলেন, ‘আসলে উত্তরবঙ্গের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোতে মোবারকপুরই আমাদের প্রথম খনন কাজ। এ ধরনের ভূমিতে খননের জন্য যন্ত্রপাতি ও আমাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় কাজে বারবার বিরতি দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গ্যাসের যে চাপ আমরা পেয়েছি তা বাণিজ্যিক উত্তোলনযোগ্য নয়।’ এ গ্যাসক্ষেত্রে আবারও খনন এবং প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে কি না তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে খনন কাজে দীর্ঘসূত্রিতা ও দীর্ঘ সময় ফেলে রাখায় গ্যাস কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক দেবাশীষ মণ্ডল বলেন, ‘বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুসারে মাটির নিচের দু’ধরনের কাঠামোয় সাধারণত গ্যাস থাকার কথা। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো সহজে শনাক্ত ও উত্তোলনযোগ্য স্ট্রাকচারাল ট্রাপের অন্তর্গত। এ জাতীয় ক্ষেত্রগুলো মোটামুটি সবই আবিষ্কৃত হয়েছে। মোবারকপুরের মতো তুলনামূলক কঠিন কাঠামোর স্ট্রাটিগ্রাফিক ট্রাপে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ দেশে আগে হয়নি। এ কারণে অনভিজ্ঞতার দরুণ কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কূপের মুখ কিছুটা সিলিং হয়ে যাওয়ায় পর্যাপ্ত চাপ পাওয়া যায়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘মোবারকপুরে কূপটি খননে দীর্ঘ সময় লেগেছে। খননের পর দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়েছিল। এর ফলেও গ্যাসের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ তবে এ বিষয়ে বাপেক্সের মহাব্যবস্থাপক (টেকনিক্যাল) তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রকল্পের বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানানোর মতো কিছু থাকলে তারা নিজেরাই ডাকবেন বলে জানান তিনি।

এই সংবাদটি 652 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ