নাগরীলিপি নবজীবনের জার্নাল। ২

প্রকাশিত: ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮

নাগরীলিপি নবজীবনের জার্নাল। ২

মোস্তফা সেলিম

সিলেটের ইতিহাস সুলিখিত, কিন্তু বইপত্রের বড় অংশই বিলুপ্ত। দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্লভ। ছাত্রজীবনে আমি দেখি শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত। পড়েছি বললে ভুলই হবে, বলতে হবে দেখেছি। বইয়ের হাজার পৃষ্ঠায় সিলেটের ইতিহাসের হাজার বছরের পরম্পরা উপস্থাপন করেছেন শ্রী অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি ১৯১০ সালে, উত্তরাংশ ১৯১৭ সালে। আমি সিদ্ধান্ত নেই, এই বই পুনর্মুদ্রণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করবে আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। সিলেট অঞ্চলের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ ছিল উৎস প্রকাশনের উদ্বোধনী প্রকাশনা। সিরিয়রদের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ চাই। কাজটি কী ঠিক করছি কি না? সকলেই জানিয়েছিলেন, কাজটি করতে পারলে, সিলেটের প্রতি বিরাট এক দায়িত্ব পালন হবে। তবে, প্রকাশকের লগ্নি ফিরে আসবে কী না, তাতে তাঁদের সংশয়ের কথা সকলেই একইসুরে জানান। আমি ছাত্ররাজনীতি করা মানুষ, ছাত্ররাজনীতি আমার অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে বটে, তবে আত্মবিশ^াসের ভিতটা আমার মধ্যে রচনা করে দিয়েছে এই রাজনীতিই। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি বইটি বের করবোই। এটাই হবে আমাদের উদ্বোধনী প্রকাশনা। প্রয়োজনে আমি হেঁটে হেঁটে বইটি বিক্রি করবো। প্রথম প্রকাশের ৯১ বছর পর আবার শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত বেরোলো, ঝমকালো প্রকাশনা অনুষ্ঠানও হলো। প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী ভূয়সী করলেন। পরদিন সিলেটের পত্রিকায় ফলাও করে শতবর্ষ প্রাচীন এ বই পুনর্মুদ্রণের খবর প্রকাশ করে। পাঠক খুব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন বইটিকে। ফলে, আমার আর হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করতে হলো না। এই শুরু, তারপর এক এক সিলেটের ইতিহাসের বহূ মূল্যবান বই বের হলো উৎস থেকে। সিলেটের লোকসাহিত্যের বইও কম বের হলো না এসময়ে। একটা সময়ে, আমাদের মনে হলো এবার নাগরীলিপির দিকে মনোযোগ দিলেই ভালো হয়। সেটা ২০০৮ সালের দিকে। আমার হাতেও রয়েছে এই সাাহিত্যেও সবচেয়ে জনপ্রিয় পুথি কেতাব হালতুন্নবী। চাইলেই কী সব হয়? কত সমস্যা। নাগরীলিপির কম্পিউটার ফন্ট তো লাগবে, লাগবে এ বিষয়ে এক্সপার্ট। সবার আগে মাথায় এল মোহাম্মদ সাদিকের নামটি। তিনি সাম্প্রতিককালে ‘সিলেটি নাগরীলিপি : ফকিরি ধারার ফসল’ নামে একটি পিইচডি করেছেন। তার সাথে আমার পরিচয় অনেকদিনের। তাঁর পিএইচডি থিসিসটি বই আকারে প্রকাশের জন্য তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। আমি প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। বইয়ের মেকাপসহ যাবতীয় কাজ যখন প্রায় শেষ, তখন একদিন সাদিকভাই এলেন আমার অফিসে। সময় পেলেই তখন আসতেন আমার প্রকাশনা অফিসে। সাদিকভাই জানালেন, এশিয়াটিক সোসাইট তাঁর বইটি প্রকাশে সম্মত হয়েছে। আমি যদি এটি ছেড়ে না দেই তবে তিনি এটি এশিয়াটিক সোসাইটিকে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাঁর সুপ্ত ইচ্ছেটি অনুধাবন করতে পারলাম। আমি সহাস্য হয়ে তাঁর বইটির মেকাপ দেওয়া প্রি-প্রেস ফাইল তুলে দিলাম প্যানড্রাইভে। তাঁর সাথে রয়েছে আমার দীর্ঘদিনের সখ্য। এই ভরসায় সাদিকভাইকে অনুরোধ করলাম, বইটির লিপ্যন্তর এবং একটি ভূমিকা লিখে দেওয়ার জন্য। তিনি ব্যস্ততার কথা বলে এড়িয়ে গেলেন আমাকে। এখন আমার উপায়! নিজেও এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না, এখন কাকে ঊপায় অবলম্বন করে অগ্রসর হবো। বিপাকে পড়লাম। একসময় মনে পড়লো মো. আব্দুল মান্নানের কথা। তিনি কয়েকমাস আগে, আমার কাছে একটি সিডিতে নাগরী হরফের একটি সফটকপি রেখে বলে গিয়েছিলেন, আমার একাজটি আপনার কাছে রেখে গেলাম। হয়তো কোনো দিন এটি কাজে লাগাতে পারবেন। আপনি ছাড়া একে কাজে লাগানোর লোক আমি খুঁজে পাই নি।
কথাটি মনে পড়ার সাথে সাথে সহকর্মী রুবেলকে সফ্টকপিটি কম্পিউটারে নিতে বললাম। দেখলাম, নাগরীলিপির হরফের কম্পিউটার সফটকপি। আনন্দে মন নেচে উঠলো। তাহলে, মান্নানভাই আমাকে সহযোগিতা করতে পারবেন। মান্নানভাই পেশায় ইলেকট্রিক ইনজিনিয়ার। মাঝেমধ্যে আমাদের বই কিনতে আসেন আমার অফিসে। বাড়ি বিয়ানীবাজারের বাহাদুরপুরে। আমার বাড়ি থেকে তিন চার মাইল দূরে। চমৎকার ভদ্রলোক। পরিশ্রমি। তাঁকে ফোনে অনুরোধ করলাম দেখা করার জন্য। তিনি এলেন। আমার মতলব জানালাম। তিনি আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, আমি ইনজিনিয়ার মানুষ, সফ্ট বানানোর একটি টুল আমার কাছে ছিল। আমি এঁটা কাজে লাগিয়ে সফ্ট তৈরী করেছি। এর বেশি কিছু তো আমার জানা নেই। আমি তাঁকে অনুপ্রাণিত করলাম। ভরসা দিলাম। আমার কথায় তিনি খানিকটা আশ^স্থ বোধ করলেন। আমি তাঁকে, কেতাব হালতুন্নবীর একটি কপি হাতে তুলে দিলাম। বললাম, চেষ্ঠা করুন। এক পৃষ্ঠা করে নিয়ে আসুন।
দুদিন পর তিনি এক পৃষ্ঠা হাতে নিয়ে এলেন। মান্নানভাই যথাযথভাবেই টাইপ করেছেন। পাশাপাশি আমার দেখানো ছকে লিপ্যন্তর করে নিয়ে এসেছেন। আমি উত্তেজিত। আমার চিৎকার করে উল্লাস করতে ইচ্ছে করছে। মনে হলো, আমি জগত জয় করে ফেলেছি। মান্নানভাইকে বললাম, হবে। আপনি কাজ শুরু করুন। তিনি আড়ষ্ঠ। জীবনে কখনো লেখালেখিতে ছিলেন না তিনি। একটি অক্ষরও তার মুদ্রিত হয় নি কখনো। আমি অভয় দিলাম। বললাম, আপনি শুধু কম্পোজ করে নিয়ে আসুন। বাকিটুকু আমি দেখবো। এই শুরু হল পথচলা। তারপরে গল্প অনেকটাই পাঠকের জানা। এই জানা এবং অজানা গল্প নিয়েই জানাবো কয়েকটি পর্বে। (চলবে)

মোস্তফা সেলিম : গবেষক ও লেখক। সিলেটি নাগরী নবজীবনের প্রাণপুরুষ।

এই সংবাদটি 616 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ