নাগরীলিপি নবজীবনের জার্নাল- ১ : মোস্তফা সেলিম:

প্রকাশিত: ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০১৮

নাগরীলিপি নবজীবনের জার্নাল- ১ : মোস্তফা সেলিম:

নাগরীলিপি নিয়ে তেমন কিছুই জানা ছিল না ছাত্রজীবনে। ইন্টারমিডিয়েট যখন পড়ছি সিলেটের মদন মোহন কলেজে, তখন প্রথম শুনতে পেয়েছিলাম এ বিষয়ে। আমাদের সিনিয়রভাই, বিয়ানীবাজারের কানলী গ্রামের আখতারুজ্জামান ছাদেক পড়তেন সিলেটের মুরারি চাঁদ কলেজে। তিনি ওই সময়ে পড়তেছিলেন বিএসসি। তাঁদের এক অধ্যাপকের বিচিত্রতা বলতে যেয়ে একদিন তিনি শুনিয়েছিলেন নাগরীলিপি নিয়ে। এই অধ্যাপককে ছাত্ররা ডাকতেন ‘নাগরীস্যার’। গণিত পড়াতেন। নাম এরহাসুজ্জামান। কিন্তু গণিতের চেয়ে তাঁর ঢের আগ্রহ নাগরী নিয়ে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নাগরীলিপি প্রসঙ্গ অবতারণা করতেন। অংকের শিক্ষক হয়েও তিনি সিলেবাস বর্হিভূত নাগরীলিপি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন প্রায় প্রতিটি ক্লাসে। ছাত্রদের নাগরী সম্পর্কে বলতেন, এই গৌরব সম্পর্কেও ধারণা দেওয়ার আন্তরিক চেষ্ঠাটি নিষ্ঠার সাথে করতেন। নাগরলিপি বিষয়ে এই সময়েই প্রথম শুনি। তারপর আগ্রহ থাকলেও কোনো কিছু জানার সুযোগ ছিল না। দশ বছর অতিবাহিত হয়েছে, এ বিষয়ে আর কোনো পাঠই নেবার সুযোগ ছিল না। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় এস এম গোলাম কাদিরের গ্রন্থ সিলেটি নাগরী : ভাষা ও সাহিত্য। বইটি পড়ে কিছুটা ধারণা পেয়েছি। ২০০৫ সালের পর অবশ্যই এ বিষয়ে আরেকটি পিএইচডি থিসিস দেখেছি। নাড়াচাড়া করেছি। এই পর্যন্তই।
শিক্ষকতা ছেড়ে ২০০১ সালে যুক্ত হই প্রকাশনা শিল্পের সাথে। প্রতিষ্ঠা করি উৎস প্রকাশন। ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা বাজার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে আমাদের আস্তানা। আজিজের প্রকাশকেরা প্রচলিত স্রােতের বাইরেই অবস্থান করে প্রথাবিরোধী প্রকাশনায় মনোযাগী।
আমি প্রকাশনায় এসে পর ভেবেছি একটি বিষয়, সেটি হচ্ছে প্রকাশনা যেমন আমার ব্যবসা হবে, রুটিরুজির সংস্থান করবে, সেভাবে প্রকাশনাও হবে আমার ব্যক্তিগত দায়শোধের অবলম্বন। কীভাবে সেটা সম্ভব, এ নিয়ে নিজের সাথে নিজের নানা বোঝাপাড়া হয়। দেশের সেবার জন্য চাইতো বড় উদযোগ, বিশাল বাজেট, চাই অভিজ্ঞতাও। আমি প্রায় অভিজ্ঞতাহীন। স্কুল ছেড়ে চলে এসেছি এ কাজে। সাহসের পুঁিজ পেয়ে গেলাম। ছাত্রজীবনে প্রেস দৌড়াদৌড়ি তো হয়েছে। ছাপাখানা, সম্পাদনা, মুদ্রণ কিছু দেখার রয়েছে সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা। ১৯৮৮ সালে পড়ি ইন্টারমিডিয়েটে, সেসময় আমার সম্পাদনায় বের হয় সাহিত্যপত্র উদ্দাম। বিয়ানীবাজারের আজির মার্কেটে আমাদের মহসিন ভাইয়ের ‘মদিনা প্রেসে’ টানা তিনমাস ছোটাছুটি করেছি। লেটার প্রেস। মহসিনভাই নিজেই মুদ্রাক্ষর। কষ্ট করে করে ব্লক বাধা হতো, তারপর হাতে চাপ দিয়ে প্রুফ বের কার হতো। খুটিয়ে খুটিয়ে প্রুফ দেখা হতো, প্রায় প্রতিদিন সঙ্গ দিতো মুস্তাফিজ শফি। তিনি এখন দৈনিক সমকালের নির্বাহী সম্পাদক। এছাড়াও আজিজুল পারভেজও ছিল নিত্যসাথী। বর্তমানে কালের কণ্ঠের চিফ রিপোর্টার। মনে পড়ে, এই প্রকাশনার ব্যয় সংস্থান হয়েছিলো আমার নানির পাঠানো টাকা থেকে। নানি জোবেদা আলী থাকতেন লন্ডনে। মাঝেমধ্যে রেজিস্টি ডাকে তাঁর চিঠি আসতো। চিঠি খুললেই পাওয়া যেতো চেক। আমি যেমন পেতাম, তেমনি পেতেন শাকুর মজিদও।
কলেজে যখন পড়ি, তখনও প্রেসের সাথে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। মদন মোহন কলেজ ছাত্রসংসদে সাহিত্য ও বিতর্ক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলাম। একই সময়ে ছাত্রাবাসের অধিনায়ক পদেও ছিলাম দায়িত্বে। ফলে, কলেজের সাহিত্য সপ্তাহের প্রকাশনা ঈষিকা সম্পাদনা করেছি। কলেজের সুবর্র্ণজয়ন্তী স্মারক প্রকাশনা কমিটিতেও কাজ করেছি ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে। ছাত্রাবাসের বার্ষিকী সংযোজন সম্পাদনা করেছি। সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠে কাজের সময়ও ছাপাখানা হ্যাপা দেখেছি।
এখানেই শেষ নয়, ১৯৯৯ সালে আমার প্রথম বই মুক্তিযুদ্ধে বড়লেখা বের হয়। তখন অবশ্য লেটার প্রেসের যুগের অবসান হয়েছে। ২০০০ সালে আরেকটি বই বড়লেখা : অতীত ও বর্তমান গ্রন্থটিও বের হয় আমার সম্পৃক্ততায়। ওই বইয়ের সহযোগী সম্পাদক হিসেবে ছাপাখানায় দৌড়ঝাপতো করেছি।
ভেবেছিলাম প্রকাশনায় কিছু মূল্যবান কাজ করতে হবে। সিদ্ধান্ত নেই, সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে প্রকাশনায় নিয়ে আসবো। সিলেট ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন জনপদ। অথনৈতিক ও প্রাকৃতিকভাবে সমগ্র দেশের মধ্যে অগ্রসর। তার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য সারাদেশের সাথে অতুলনীয়। হজরত শাহজালালের পুন্যভুমি এই সিলেট বৈঞ্চব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যের পিতৃভূমি। বাংলাভাষার অহংকারে দীপ্ত এ ভূমিতে সুচিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের বীজ। বাংলা ভাষার বিকল্প লিপি সিলেটি নাগরীর সূতিকাগার এই সিলেট বাংলা মরমি গানের সা¤্রাজ্য। বাউল, মরমি যুথবদ্ধভাবে এই জনপদকে প্লাবিত করেছে।
সিলেটের ইতিহাস সুলিখিত, কিন্তু বইপত্রের বড় অংশই বিলুপ্ত। দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্লভ। ছাত্রজীবনে আমি দেখি শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত। পড়েছি বললে ভুলই হবে, বলতে হবে দেখেছি। বইয়ের হাজার পৃষ্ঠায় সিলেটের ইতিহাসের হাজার বছরের পরম্পরা উপস্থাপন করেছেন শ্রী অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি ১৯১০ সালে, উত্তরাংশ ১৯১৭ সালে। আমি সিদ্ধান্ত নেই, এই বই পুনর্মুদ্রণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করবে আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। সিলেট অঞ্চলের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ ছিল উৎস প্রকাশনের উদ্বোধনী প্রকাশনা। (চলবে)

মোস্তফা সেলিম : গবেষক ও লেখক। সিলেটি নাগরী নবজীবনের প্রাণপুরুষ।

এই সংবাদটি 723 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ