ঢাকা |
প্রকাশিত: ৪:৩৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০১৭
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বন্যাদুর্গত একটি মানুষকেও না খেয়ে থাকতে হবে না। যেসব কৃষক ও সাধারণ মানুষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন ফসল তাদের ঘরে না উঠছে, ততদিন অর্থাৎ তিন মাস তাদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে। এ সময় পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে বিনামূল্যে সার, কীটনাশক ও কৃষি উপকরণ দেয়া হবে। তারা যাতে পুনরায় কৃষিঋণ পেতে পারেন, বীজ ও বীজতলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে পারেন, তার জন্য যা যা করা দরকার, তা তা করব।’
রোববার দিনাজপুরে জিলা স্কুল মাঠে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। এর আগে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। পরে কুড়িগ্রামে দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখে ত্রাণ বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেও একই কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, বন্যায় যাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে, সেই ঘরবাড়ি যাতে দ্রুতই তৈরি করা যায়, তার জন্য এরই মধ্যে টিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি ঘর তৈরি করা বা মেরামত করার ব্যবস্থা ইনশাআল্লাহ আমরা করে দেব। যেসব ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করতে পারেনি বা বইখাতা নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের মাঝে পুনরায় যাতে বই বিতরণ করা যায়, সেই ব্যবস্থা আমরা নেব। শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সে ব্যাপারেও বিশেষ উদ্যোগ নেবে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সংস্কার করা হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে রাস্তা মেরামতের কাজ শুরু হবে। যেসব রাস্তা নষ্ট হয়েছে, দ্রুত তা মেরামত করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনও যথাসময়ে মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো প্রস্তুত রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, উত্তরবঙ্গে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার ছিল। হাহাকার লেগেই থাকত। প্রতিনিয়ত মঙ্গা। আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এই উত্তরবঙ্গে কোনো মঙ্গা হবে না। প্রত্যেক মানুষ যেন খাদ্য পায়, কাজ পায়, তার ব্যবস্থা আমরা করব। আমরা মন্দা দূর করেছিলাম। দুর্ভাগ্য, আমরা ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারিনি। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে আবার দেশে মঙ্গা দেখা দেয়। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আমরা যে ব্যবস্থা নিয়েছি, তাতে গত আট বছরে এ অঞ্চলে আর মঙ্গা হয়নি। এবার বন্যা হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এ বন্যায় মানুষ হয়তো কষ্ট পাবে। সৃষ্টি হবে মঙ্গা। আমি বলছি, কাউকেই কষ্ট করতে হবে না। বন্যা দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বিদেশ থেকে খাদ্য কিনতে শুরু করেছি। ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য কিনছি। খাদ্য যথেষ্ট মজুদও আছে। যেসব এলাকায় খাদ্যশস্য নষ্ট হয়েছে, ক্ষতি হয়েছে, প্রতিটি মানুষ যাতে ক্ষুধার অন্ন পায়, ইনশাআল্লাহ সে ব্যবস্থা আমরা করব। এটুকু ভরসা আপনারা আমার প্রতি রাখতে পারেন। আপনাদের প্রত্যেকের কাছে ত্রাণ পৌঁছবে। একটি মানুষও না খেয়ে কষ্ট করবে না, না খেয়ে মারা যাবে না। আপনাদের একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে এবং আমাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টার দিয়ে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘৫০ লাখ পরিবারকে আমরা ১০ টাকায় চাল দেব। বন্যা মোকাবেলায় সেনাবাহিনী, প্রশাসন, বিজিবি, পুলিশসহ প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে টিম তৈরি করে নেতাদের দায়িত্ব দিয়ে সুষ্ঠুভাবে রিলিফ দেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার আসবেই, দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে। মানুষের জানমালের ক্ষতি যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করাই আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য। আমরা সেইভাবে সব কর্মপরিকল্পনা নিচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোয় বলেছি, বিষয়গুলো যেন খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। নির্দেশ দিয়েছি, বন্যার্তদের যাতে দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এখনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানি জমে আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমি নির্দেশ দিয়েছি, ওইসব ক্ষেত্র থেকে পানি সরাতে প্রয়োজনে রাস্তা কেটে, খাল খনন করাসহ যা যা প্রয়োজন, তা করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, দরিদ্র মানুষ ও সাধারণ মানুষের জন্য আমাদের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের উন্নয়ন হয়। আমরা গৃহহীন মানুষকে ঘর তৈরি করে দিচ্ছি। যাদের ঘর নেই অথবা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের প্রয়োজনে খাস জমি অথবা জমি কিনে হলেও ঘরবাড়ি তৈরি করে দেব।
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, আমি আপনাদের জন্য রাজনীতি করি। আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি আপনাদের, বাংলার মানুষের জন্য কাজ করছি। যেভাবে আমার বাবা জীবন দিয়ে গেছেন- আমিও আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তন, উন্নয়নে প্রয়োজনে জীবন দেব। এটা আমার প্রতিজ্ঞা। কারণ আমি নিজেকে উৎসর্গ করেছি বাংলার মানুষের জন্য।
এনজিওগুলোর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আমি জানি অনেক এনজিও ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে থাকে। তাদের বলব, বানভাসি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর কাছ থেকে যেন ঋণের জন্য না যাওয়া হয়। ঋণের জন্য জুলুম করা না হয়। আমি সব এনজিওকে নির্দেশ দেব, তাদের কাছে ঋণ তোলার জন্য যেন না যাওয়া হয়।
সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারে দিনাজপুরে আসেন প্রধানমন্ত্রী। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে জিলা স্কুলে এসে ত্রাণ বিতরণ করেন। বক্তৃতা দেন। দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম, সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মনোরঞ্জন শীল গোপাল, শিবলী সাদিক, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানকসহ দলীয় নেতারা অনুুষ্ঠানে ছিলেন।
পরে সড়কপথে বিরল উপজেলার তেঘরা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মতিয়া চৌধুরী, এএইচ মাহমুদ আলী, মোস্তাফিজুর রহমান, ইকবালুর রহিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি বক্তব্য দেন। এখানে প্রধানমন্ত্রী বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে বিত্তবানসহ সবার প্রতি আহ্বান জানান।
কুড়িগ্রামে প্রধানমন্ত্রী : পরে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে কুড়িগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন। বিকাল ৩টায় রাজারহাট হ্যালিপ্যাডে অবতরণ করেন তিনি। কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে পাঙ্গা হাইস্কুল মাঠে ত্রাণ বিতরণ করেন। হাজারও মানুষের বিশাল জনসভায় ৩৩ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) দেশের মানুষকে বেশি ভালোবাসতেন। তাই তিনি দেশের মানুষের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমি দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ও কল্যাণে জীবন দিতে প্রস্তুত আছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আগামী মাস থেকে দেশের ৫০ লাখ মানুষকে ১০ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি করে চাল তিন মাস দেয়া হবে। দেশে যেন খাদ্য ঘাটতি না হয়, সেজন্য চাল আমদানির ওপর শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ ভাগ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৫ লাখ টন খাদ্য আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এনজিওর উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা ঋণ দিয়েছেন, (কিস্তি আদায়ে) দয়া করে বন্যাকবলিত মানুষকে অত্যাচার ও জুলুম করবেন না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ১৯৮১ সাল থেকে কুড়িগ্রামের প্রতিটি উপজেলায়, ইউনিয়নে ঘুরে বেড়িয়েছি। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখেছি। তখন এ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা লেগে থাকত। সরকারে না থেকেও তখন মানুষের পাশে ছিলাম। লঙ্গরখানা খুলেছি। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে এ জেলার জন্য অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়েছি। যাতে করে গ্রামের মানুষটিও ভালো থাকতে পারে। অল্প সময়ে কুড়িগ্রামকে খাদ্য উদ্বৃত্ত করতে সক্ষম হই। এখন আর মঙ্গা নেই।
এরপর ২১ বন্যার্ত নারী-পুরুষের হাতে সরাসরি ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন তিনি। পরে স্থানীয় প্রশাসন ৯৭৯ বন্যার্তর মাঝে এ প্যাকেজের ত্রাণ বিতরণ করে। প্রতিটি প্যাকেটে ছিল ১০ কেজি চাল, ১ কেজি করে ডাল, লবণ, চিনি, চিড়া, তেল, আধা কেজি মুড়ি, মোমবাতি ও দেয়াশলাই।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাফর আলী, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম মোজাম্মেল বক্তব্য দেন। উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সফুরা খাতুন, রুহুল আমিন, মোস্তাফিজার রহমান, সাবেক মন্ত্রী মোতাহার হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মণ্ডল, লালমনিরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, আবু নুর মো. আক্তারুজ্জামান প্রমুখ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান।
রেজিঃ নং চ-৭৩৫
সম্পাদক ও প্রকাশক: এম.ফয়জুল হক শিমুল
সহ: সম্পাদক : হাবিবুর রহমান সুলতান
সহ: সম্পাদক : নুরুল হক মাসুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক নিউ বর্ণমালা অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, রাজা ম্যানশন জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: * সি-৮/৩০ বনশ্রী ঢাকা।
সিলেট অফিস: কমন মার্কেট (৫ম তলা ) বন্দর বাজার, সিলেট।
বিয়ানীবাজার অফিস: ছফর কমপ্লেক্স, দক্ষিণ বিয়ানীবাজার, সিলেট।
যোগাযোগ মোবাইলঃ +88-01713813124
ই-মেইল ॥ somoychitro@gmail.com
বড়লেখা অফিস: নেহার মার্কেট, ( ২য় তলা), বড়লেখা, মৌলভীবাজার।