ঋণের জালে আবদ্ধ গোলাপগঞ্জের হাকালুকি হাওরের কৃষকরা

প্রকাশিত: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০১৭

জাহিদ উদ্দিন, গোলাপগঞ্জ: তাকমল হোসেনের দুচোখে কেবলই নোনা অশ্রু। দিগন্ত বিস্তীর্ণ জলের কান্নার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাঁদছে পরাণটাও। একদিকে পরিবার পরিজন নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর অন্যদিকে ঋণের জ্বালা। জনতা ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার টাকা  ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণপুর গ্রামের হাকালুকি হাওরের কৃষক তাকমল হোসেন । ৭ বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে পারলে অনায়াসে তার
এক বছর চলে যেত। কিন্তু হাওরে আগাম বন্যায় সব ধান তলিয়ে গেছে। এখন পরিবারের খোরাক নিয়েই চিন্তিত তিনি। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচই বা কোথা থেকে আসবে, ভেবে পাচ্ছেন না। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ।
শুধু তাকমল হোসেনই নন, বৃহস্পতিবার সরেজমিন কালিকৃষ্ণপুর, রাংজিওল, ইসলামপুর গ্রাম পরিদর্শনে গেলে দেখা যায় হাওর পারের প্রায় ৫ হাজার কৃষকের এসব করুণ চিত্র। এ তিনটি গ্রামের চারিদিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি বেষ্টিত রয়েছে।এসব এলাকার লোকদের হাকালুকি হাওরের বোরো ধানই তাদের একমাত্র বাঁচার অবলম্বন। অনেক আশা ও হাজারো স্বপ্ন নিয়ে করেছিলেন বুরো চাষ। তাদের এই স্বপ্নের সোনালী ফসল এখন পানির সাথে মিশে গেছে । এ যেন স্বপ্নের অপমৃত্যু । অন্যদিেেক মরার উপর খাড়ার ঘা হয়েছে ঋণের টাকা।এসব এলাকার বেশির ভাগ কৃষক সরকারি-বেসরকারি ও মহাজনী ঋণের জালে আবদ্ধ।বেঁচে থাকার তাগিদে ও গো-খাদ্যের অভাবে প্রায় সব কৃষক গৃহপালিত গবাদি পশু কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
তাকমল হোসেনের মতোই অবস্থা হাজার

হাজার কৃষকের। তাদের বেশির ভাগই গ্রামীণ
ব্যাংক, ব্র্যাক না হয় কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ
নিয়ে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিল। অনেকে
মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে
নিয়েছেন উচ্চ সুদে ঋণ। কিন্তু ফসল হারিয়ে
ওরা প্রায় নিঃস্ব। ঋণ এখন বিষ ফোঁড়ার
মতো তাদের কাঁধে চেপে বসেছে। সব

মিলিয়ে দিশেহারা কৃষক ।
কালিকৃষ্ণপুর গ্রামের ফিরোজ মিয়া (৬০) বলেন, বন্যার পানিয়ে (পানিতে) তলায় (তলিয়ে) গেছে আমার সারা (সমস্ত) বোরো ধান। গরু মহিষের জন্য ধার করে আনছি খেড় (গরুর শুকনো খাবার)।মাছও ভাইসা (ভেসে) গেছে হাওরে। এখন আমরা কিতা করতাম (কি করবো)।আমরারে (আমাদের) দেখার কেউ নাই (নেই)। তিনি আরো জানান এবার বোরো মৌসুমে তার আবাদকৃত ৪০ বিঘা জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে গোঁ-খ্যাদ্যে পরিণত হয়েছে।
ঐ এলাকার, বায়োবৃদ্ধ বিধবা ফুলবানু (৬৫) জানান, তিনি ৩০ শতক জমির উপর বুক ভরা আশা নিয়ে বোরো ধান রোপন করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে তার সুখ ও শান্তি।
এ ব্যাপারে এ ওয়ার্ডে সাবেক ইউপি সদস্য এম কবির উদ্দিন জানান, অকাল বন্যায় শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণপুর, ইসলাম পুর ও রাংজিওল এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফসলের জমি ও গরু বাছুর হারিয়ে কৃষক ও জেলেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় প্রকৃতিক দূর্যোগের পর শিক্ষামন্ত্রীর বিশেষ প্রতিনিধি সৈয়দ মিছবাহ উদ্দিন ছাড়া আমাদের খোঁজখবর কেউই নেয়নি।তিনি এসব এলাকার অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মানবিক দিক বিবেচনা করে  কৃষকদের ব্যাংকের ঋণ মওকুফ করার জোর দাবি জানান।
এলাকাবাসী জানায়, কৃষক আব্দুল মান্নান (৬০), খালিক মিয়া, সেনওয়ারা বেগম (৩২), গৌছ মিয়া (৪৫), মুসলেম মিয়া (৬৫), লিয়াকত মিয়া (৭০), কাজল মিয়া (৩২), একবুল হোসেন (৪৫), ধানিছ মিয়া (৪২), সফিক উদ্দিন (৩৩) সহ আরো অনেকেরই   ফসল তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে।
এই এলাকার ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিএনএস শাপলা বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, বন্যায় কালিকৃষ্ণপুর এলাকায় শত শত মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিন্তু কেউই এদের খোঁজখবর নেয়নি।এটা খুবই দুঃখজনক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, হাওরপাড়ের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষদের আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। সাধ্যমত আমরা সহযোগীতাও করছি।

এই সংবাদটি 582 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ