আপ্লুত ভারত, উত্তেজনা কমার আশা

প্রকাশিত: ৩:৫৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০১৯

আপ্লুত ভারত, উত্তেজনা কমার আশা
বন্দি বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান, যার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুক্রবার রাতে অভিনন্দন ফিরে আসার পরপর তাকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক টুইটে লিখেছেন, “ওয়েলকাম হোম উইং কমান্ডার অভিনন্দন! তোমার দৃষ্টান্তস্থাপনকারী সাহসিকতায় জাতি গর্বিত। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ১৩০ কোটি ভারতবাসীর অনুপ্রেরণা। বন্দে মাতরম!”

বিমান বাহিনীর এই পাইলটকে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও।

অভিনন্দন দেশে ফেরায় ভারতজুড়ে উৎসবের আমেজ চলছে বলে লিখেছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া। বিমান বাহিনীর এই পাইলটকে ‘সত্যিকার হিরো’ হিসেবে বর্ণনা করে টুইট করেছেন ভারতের ক্রীড়া ও অভিনয় জগতের তারকারা।

বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি রজীনী বৈদ্যনাথ মনে করছেন, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দুই দেশ যুদ্ধের দুয়ার থেকে ফিরছে।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের মাটিতে ‘জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা’ বন্ধের বিষয়ে দেশটির কাছে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চায় ভারত। শুক্রবারই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন, এ বিষয়ে কাজ করবেন তিনি।

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে টেলিফোন করে দ্রুত সংকটের সুরাহা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী শুক্রবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে টেলিফোন করে তাদের মধ্যস্ততার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে পাকিস্তানের দৈনিক ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রাশিয়ার এই প্রস্তাবের আগের দিন বৃহস্পতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকার মধ্যস্ততায় ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কমছে।

এই ধরনের মধ্যস্ততার মধ্য দিয়েই এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন ইউএস ইনস্টিটিউট অফ পিসের বিশেষজ্ঞ মোঈদ ইউসুফ। অতীতেও নয়া দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে সংকট তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চীন, ব্রিটেন ও রাশিয়া মিলে মধ্যস্ততায় সুফল মেলার কথা বলেছেন তিনি।

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এই উত্তেজনার শুরু গত ১৪ নভেম্বর ভারত শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী হামলায় দেশটির সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) ৪০ জনের বেশি জওয়ান নিহত হওয়ার পর।

এর জের ধরে মঙ্গলবার ভোররাতে ভারতের বিমান বাহিনী নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে পাকিস্তানের বালাকোটে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর অন্তত ৫০টি স্থানে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দিকে মর্টার শেল ছোড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা।

তারপর বুধবার সকালে পাকিস্তানি জঙ্গি বিমান ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজৌরি জেলায় নওশেরা সেক্টরে বোমাবর্ষণ করলে আকাশে শুরু হয় লড়াই। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভূপাতিত হয় ভারতের একটি মিগ-২১ বিমান, প্যারাশুট দিয়ে নেমে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হন পাইলট অভিনন্দন বর্তমান।

ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানে ঢুকে জঙ্গি আস্তানায় হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়ার প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভোটের পাল্লায় লাভবান হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

বালাকোট অভিযানের পর থেকে ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনীতির অঙ্গনেও প্রবল জাতীয়তাবাদী প্রচারের প্রকাশ ঘটছিল। কিন্তু অভিনন্দন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ার পর পরিস্থিতি উল্টে যায়। 

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন, শান্তির নিদর্শন হিসেবে ভারতীয় বৈমানিককে ফিরিয়ে দেবেন তারা।

অভিনন্দনের প্রত্যাবর্তন ঘিরে শুক্রবার চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করা হয় পাঞ্জাবের ওয়াগা সীমান্তে। ‘জাতীয় বীরকে’ স্বাগত জানাতে সকাল থেকেই সীমান্তে জড়ো হন কয়েক হাজার ভারতীয়। তাদের অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, গায়েও ছিল জাতীয় পতাকা, মুখে ছিল বন্দে মাতরম আর অভিনন্দনের প্রশংসা। তাদের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত থাকে সীমান্ত এলাকা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দিতে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ শুক্রবার সকালে ইসলামাবাদ থেকে সড়কপথে তাকে লাহোরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে করে বিকালে তাকে নেওয়া হয় ওয়াগা সীমান্তে।

সেখানে অভিনন্দনের ডাক্তারি পরীক্ষা হয়। এরপর ওয়াগা-আতারি সীমান্তে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে চলে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা। জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী কাগজপত্র ঠিক করতে দুই দফা হস্তান্তরের সময় পরিবর্তন করে পাকিস্তান।

এই সংবাদটি 621 বার পঠিত হয়েছে

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ